করোনা টিকার সার্বজনীন অধিকার: প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান ও বাস্তবতা
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। আপডেট ১৪:০০
আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম জাতিসংঘে এবারসহ মোট ১৮ বার ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ভাষণে প্রতিবারই ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ। নিজের
অভিমত বিশ্ব দরবারে প্রতিফলিত করেনও বঙ্গবন্ধুর মতো করেই। এবারের ভাষণেও ছিল এরই
প্রতিচ্ছবি। এবার করোনা মুক্ত বিশ্ব গড়তে সার্বজনীন ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা প্রাপ্যতায়
বৈশ্বিক পদক্ষেপ দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের সঙ্গে
বাস্তবতার মিল কতখানি? বিস্তারিত আসাদুজ্জামান সুপ্ত-এর প্রতিবেদনে…
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে যতবারই ভাষণ দিয়েছেন, ততবারই বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ বিপর্যয়, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। এবারের অধিবেশনেও একই পথে হেঁটেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। টিকা-বিভাজন প্রবণতা নিয়ে বিশ্ববাসী তথা উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করেছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে বর্তমান ‘টিকা-বিভাজন’ প্রবণতা করোনাকে দীর্ঘস্থায়ী করবে বলে তিনি হুশিয়ার করেছেন। তিনি বলেছেন জরুরিভিত্তিতে এ টিকা বৈষম্য দূর করতে হবে তা না হলে কখনই টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।
গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার দেয়া বাংলা ভাষণে তিনি এসব একথা বলেন। কোভিড-মুক্ত বিশ্বের জন্য, বিশ্বব্যাপী সকল মানুষের জন্য সার্বজনীন ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে বলে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শেখ হাসিনা ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে টিকা বৈষম্য বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ যাবৎ উৎপাদিত টিকার ৮৪ শতাংশ উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, নিু আয়ের দেশগুলো ১ শতাংশেরও কম টিকা পেয়েছে। জরুরিভিত্তিতে এ টিকা বৈষম্য দূর করতে হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে টিকা থেকে দূরে রেখে কখনই টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। আমরা পুরোপুরি নিরাপদও থাকতে পারবো না। তিনি বলেন, অবিলম্বে টিকা প্রযুক্তি হস্তান্তর টিকার সমতা নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে। প্রযুক্তি সহায়তা ও মেধাস্বত্ত্বে ছাড় পেলে বাংলাদেশও বিপুল পরিমাণে টিকা তৈরি করতে সক্ষম।
প্রধানমন্ত্রীর কথার সুরে কথা বলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসাও। টিকায় বৈষম্যকে মানবতার জন্য কলঙ্ক বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, চাহিদা মোতাবেক বিশ্বের অনেক দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশ করোনার প্রতিষেধক টিকা পাচ্ছে না। এতে ওইসব দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর লাগাম টানা কষ্টকর হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চলতি বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে ১১ বিলিয়ন ডোজ টিকার প্রয়োজন। তবে ভ্যাকসিন সঙ্কট বৃদ্ধি পাওয়ায় সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, এককভাবে এ সমস্যা নির্মূল করা সমাধান সম্ভব নয়। কোভিড-১৯ বিষয়ক এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি উন্নয়নশীল ও নিু আয়ের দেশগুলোকে বিনামূল্যে আরও ৫০ কোটি ডোজ টিকা সহায়তার ঘোষণা দেন। এর আগে আমেরিকা বিনামূল্যে ৬০ কোটি ডোজ টিকা সহায়তার কথা জানিয়েছিল। বাইডেনের এ ঘোষণার ফলে আমেরিকার টিকা সহয়তার পারমাণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১১০ কোটি ডোজে। অন্যদিকে, স্পেনও ইতোমধ্যে ৩ কোটি ডোজ টিকা সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আর জাপান আরও ৬ কোটি ডোজ টিকা দেবে বলে জানিয়েছে।
এদিকে, চার দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোট কোয়াডে (কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়লগ) অক্টোবরে ৮০ লাখ ডোজ টিকা দেবে ইন্ডিয়া। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে কোয়াডের সদস্যরাষ্ট্রসমূহের বৈঠকে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সরবরাহ করা এই ডোজগুলো হবে করোনা টিকা জনসন অ্যান্ড জনসনের।
কোয়াডে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিকার ডোজগুলো প্রস্তুত করা হবে ইন্ডিয়াতেই। আর এ খাতে টাকার যোগান দেবে আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স কর্পোরেশন এবং জাপানের ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন। টিকা ডোজ প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পর এশিয়ার দেশগুলোতে তা বিতরণের ব্যবস্থা করবে অস্ট্রেলিয়া। এশিয়ার দেশগুলোতে জরুরিভিত্তিতে টিকা বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোয়াড।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও বিশ্ব নেতাদের করোনার টিকা বিতরণ একসূত্রেই গাঁথা। আদতে বিশ্ব নেতাদের উচিৎ করোনার টিকার মেধাস্বত্ব সার্বজনীন করে দেয়া সেক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল বহু দেশই নিজেরাই পর্যাপ্ত টিকা উৎপাদন করতে পারবে। শুধু নিজেদের জন্যই নয় বরং চরম দরিদ্র অনেক দেশেই সেই টিকা বন্টনও করেতে পারবে। আর তাতে দ্রুতই বিশ্বে সমহারে টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

