জিয়ার শাসনামলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড : প্রকৃত সত্য উন্মোচন ও বিচারের লক্ষ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক

জিয়ার শাসনামলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড : প্রকৃত সত্য উন্মোচন ও বিচারের লক্ষ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক

বদরুদ্দোজা মোঃ ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম এমপি। রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১ । আপডেট১৩:২৬

এ লেখার শুরুতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান ও আমেরিকা সফর থেকে দেশে ফিরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে (৪ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরকে ‘নির্বিচারে হত্যার’ ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সময়োচিত, সঠিক ও অত্যন্ত সাহসী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কথিত বিচারের নামে কতজন সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তার সঠিক হিসেব মেলানো দায়। ওই আমলে মোট কতটি অভ্যুত্থান হয়েছে তারও সঠিক হিসেব পাওয়া যায়নি। অতি সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একটা তালিকা প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ সকল হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। জিয়ার আমলের ওইসব হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কিংবা তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে স্বজনহারাদের পরিবার। চলতি মাসের শুরু থেকেই তারা বিচারের দাবিতে মানববন্ধনও করে চলেছেন। ইতোমধ্যে সরকারও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনা সদস্য। এরপর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার পর ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। তার পরের বছর তিনি রাষ্ট্রপতির পদও নেন। জিয়া ক্ষমতা দখলের পর সামরিক বাহিনীতে অনেকগুলো বিদ্রোহ-অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়, যাতে জড়িতদের সামরিক আদালতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ডসহ নানা সাজা দেয়া হয়।

গবেষক ও বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, ওই আমলে (১৯৭৫-৮১) সর্বমোট ২১টি অভ্যুত্থান ঘটেছে। তবে এই তথ্যের সঙ্গে অনেকেই যোগ করে ২৬টি পর্যন্ত অভ্যুত্থানের কথা জানিয়েছেন। এসকল অভ্যুত্থানে বিচারের নামে কতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তার এখন পর্যন্ত সঠিক হিসেব মেলানো দায়। এই সংখ্যার বাইরের কোনো মৃত্যুর দালিলিক প্রমাণ না থাকায় পরিবারের কাছে নিখোঁজের তালিকায়ই আছেন বাকিরা।

তবে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই আমলের নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ৪৫ বছর পরে এসে এই তালিকা কতটা বিশুদ্ধভাবে তৈরি করা যাবে সেটা নিয়ে রয়ে যায় সংশয়। কেননা ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের অভ্যুত্থান নিয়ে ঢাকা, বগুড়া ও কুমিল্লা কারাগারের নথি ঘেঁটে সাংবাদিক জায়েদুল আহসানের লেখা বই রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসিতে তিনি লিখেছেন, ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর ঢাকায় সামরিক বাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালের কথিত বিচারে সেনা ও বিমানবাহিনীর যেসব সদস্যকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে ১৯৩ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়।

ওই ঘটনায় পূর্বাপর মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এটা স্পষ্ট যে বিচারের আওতার বাইরেও অনেককে মরতে হয়েছে। ১৯৮৭ সালে বিমানবাহিনী থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস বইতে এই অভ্যুত্থানের দিনকে ‘কালো দিন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বইটিতে এই বিদ্রোহের কারণে সরকার নির্দেশিত বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার ও পরে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মোট ৫৬১ জন বিমান সেনা হারানোর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। জিয়ার রহমানের আমলে এসকল হত্যাকাণ্ড নিয়ে কমিশন গঠনের প্রস্তাবও এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টির ওপর আলাদা নজর দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, পঁচাত্তরের পর এই বাংলাদেশে বারবার ক্যু হয়েছে। এবং এই ক্যুর নামে শুধু এয়ারফোর্সের অফিসার বা সৈনিক-কর্মচারীই না, সেনাবাহিনীরও বহুজনকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, যাদেরকে ওই সময়ে হত্যা করা হয়েছে, গুম করে ফেলায় তাদের পরিবারের সদস্যরা লাশও পায়নি। তারা যে এভাবে ‘হারিয়ে গেল’ তারও কোনো জবাবদিহি হয়নি। সরকারপ্রধান বলেছেন, ৭৭ সালে তখন ক্যুর নামে, বিশেষ করে বিমানবাহিনীর ৫৬২ জন অফিসারসহ বহু লোককে মারা হত্যা করা হয়েছে। এর মাঝে আরও কয়েকটি ক্যু হয়, সেটা নিয়ে প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি বিমান ও সামরিক বাহিনীর অফিসারকে মারা হয়। বিষয়টা নিয়ে যেহেতু দাবি উঠছে, জিয়ার আমলে সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের সঠিক ও প্রকৃত সত্য উšে§াচন ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে এই বিষয়ে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত। দেরি না করে অবিলস্বে এটা করা উচিত।

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading