রেইনট্রি ধর্ষণ মামলা: খালাসের পরে চারিদিকে ক্ষোভ
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৪ নভেম্বর ২০২১। আপডেট ১০:১২
গত ১১ নভেম্বর রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের পর পর্যবেক্ষণে আদালত পুলিশের উদ্দেশে ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর মামলা না নিতে ‘পরামর্শ’ দেন। আদালতের এমন পরামর্শে ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করেছেন দেশের নারী সংগঠনসহ বিশিষ্টজনরা। বিস্তারিত লিখেছেন গাজী কাইয়ুম…
ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে চার বছর আগে দুই তরুণীকে ধর্ষণের আলোচিত মামলার রায়ে অভিযুক্ত সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দিয়েছে আদালত। ঢাকার ৭ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহার গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, ঘটনার ৩৮ দিন পর মামলা হল, চিকিৎসক মেডিক্যাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাননি মর্মে মতামত দিলেন, ভুক্তভোগীদের পরিধেয় কাপড়ে কোনো পুরুষের সিমেন্সের কনা পাওয়া যায় নাই। ৭২ ঘণ্টার পর মেডিকেল পরীক্ষা করা হলে যে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় না, সে কথা তুলে ধরে বিচারক পুলিশকে ওই সময়ের পরে কোনো মামলা নিতে না বলেছেন। এই নির্দেশনাতেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন নারী সংগঠনসহ সমাজের বিশিষ্টজনরা। তারা মহামান্য আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছেন এতে অপরাধীদের জন্য মুক্তি পাওয়া অনেক সহজ হবে। তাতে ভুক্তভোগীরা সঠিক বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন।

| ‘পাওয়ার সিজ’ করতে চিঠি দেবো “আমি উনার রায়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না। অবজারভেশনে এ সম্পর্কিত উনি যে বক্তব্য দিয়েছেন এ নিয়ে বলতে পারি, এটা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক এবং এই কারণে আগামীকাল (আজ) প্রধান বিচারপতির কাছে বিচারক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় সেজন্য একটা চিঠি লিখছি।” গতকাল শনিবার (১৩ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক-এর মন্তব্য |
ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়: এ পর্যবেক্ষণ নিয়ে মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, এ ধরনের পরামর্শ ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল যারা নির্যাতনের শিকার হন, তারা যেন বিচার পান সেই পথ যত সুগম হয়, সেই ব্যবস্থা করা। সেখানে যদি ভিকটিমের বিপরীতে যায়, এমন কোনো পরামর্শ আসে, তখন হতাশ লাগে।
প্রভাবশালীদের দাপট বাড়বে: গণমাধ্যমে পাঠানো প্রগতিশীল নারী সংগঠনগুলোর বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে ধর্ষণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একশ’টি ঘটনার মধ্যে গড়ে মাত্র ২৩টিতে মামলা হয়। প্রভাবশালীদের দাপটে মামলা ও বিচার অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়। ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ যেন মামলা না নেয়, আদালতের এমন পরামর্শে অর্থ ও ক্ষমতাধারী অপরাধীরা অসহায়-দরিদ্র ভিক্টিমদের ৭২ ঘণ্টা মামলা করতে না দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে। এই নির্দেশনা প্রভাবশালী অপরাধীদের-ই সহযোগিতা করতে পারে।
বিচারপ্রাপ্তির সুযোগকে সংকুচিত করবে: অন্যদিকে, এমন পরামর্শে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তারা জানায়, মামলা দায়ের করার জন্য বিধিনিষেধ বিচারপ্রাপ্তির সুযোগকে সংকুচিত করবে, যা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। ভবিষ্যতে ধর্ষণের ঘটনায় ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
আইন ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সাংঘর্ষিক: এদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে, বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থায় কোনও অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা গ্রহণের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অপরাধ সংঘটনের অনেক বছর পরও মামলা ও বিচারকাজ সম্পাদিত হওয়ার নজির রয়েছে। যেখানে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর বারবার জোর দেওয়া হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে উচ্চ আদালত বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেছেন, সেখানে এ মামলার ক্ষেত্রে আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা আমাদের হতাশ করেছে। আসক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা প্রকৃতপক্ষে বিদ্যমান আইন ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সাংঘর্ষিক।
প্রসঙ্গত, রায় হচ্ছে কোনো একটি মামলায় দ বা সাজার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত। আর রায়ের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ওই মামলা প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারকের অভিমত,ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ; যা বিচারক প্রত্যাহার বা বাতিল করতে পারেন। নিন্ম আদালতের রায়ের মতোই পর্যবেক্ষণ উচ্চ আদালত কিংবা বাতিল করতে পারে।

