দানশীলতায় বাংলার কিংবদন্তী হাজী মুহাম্মদ মহসীন
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৩:৫৫
হাজী মুহাম্মদ মহসীন উপমাহদেশের বাংলার একজন জনহিতৈষী, দানবীর। দানশীলতার জন্য হাজী মোহাম্মদ মহসীন মানুষের কাছ থেকে দানবীর খেতাব পেয়েছিলেন। পুরো বাঙালী জাতি মুসলিম হিন্দু সকলের কাছে সমান শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। দান, দয়া এবং মানবতার জন্য ইতিহাসে মোহাম্মদ মহসীন এক কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছেন। তার দয়া ও মহানুভবতার কথা আজও প্রচলিত আছে রূপকথার মত। কিংবদন্তী দানবীরকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানবীর হিসাবে খ্যাত হাজী মোহাম্মদ মহসীন ১৭৩২ খ্রীষ্টাব্দে ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ছিল হাজী ফয়জুল্লাহ এবং মায়ের নাম ছিল জয়নাব খানম, মোহাম্মদ মহসিনের বাবা ছিলেন খুবই ধনী একজন জায়গিরদার, মহসিনের পিতা মুঘল আমলে ইরান থেকে বাংলায় এসে বসবাস শুরু করেন। তার পিতৃপুরুষরা সব ছিলেন ইরানের অধিবাসী শিয়া মুসলমান।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
হাজী মোহাম্মদ মহসীন তার সৎ বোন মন্নুজান কাছে মানুষ হন। মন্নুজানের কোনো সন্তান না থাকায় তিনি মহসীনকে মাতৃস্নেহে লালন–পালন ও মানুষ করেন। মন্নুজান ছিলেন খুব বিদুষীমহিলা। তিনি মহসীনকে আগা শিরাজীর কাছে দিলেন শিক্ষাদানের জন্য। তার কাছে পাঠ শেষ করে মহসীন রাজধানী মুর্শিদাবাদের এক বিখ্যাত মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ভর্তি হলেন।
বিশ্ব ভ্রমণের আকাঙক্ষা থেকে ঘর ত্যাগ
মহসীনের ছোটবেলা থেকেই দেশ–বিদেশে ঘুরে বেড়াবার স্বপ্ন ছিলো। তার শিক্ষক আগা সিরাজীও তাকে দেশ–বিদেশে ভ্রমণে বরাবরই উৎসাহ জুগিয়ে এসেছেন। বোন মন্নুজানের সম্মতি নিয়ে তিনি একদিন দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে স্বদেশের সব দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখে নিলেন। তারপর হজের উদ্দেশ্যে মক্কা–মদিনার পথে রওয়ানা দিলেন। সেই কালে পায়ে হেঁটেই হজ করতে যেতে হতো। পথে তাই তাকে অনেক বিপদ–আপদ ও শ্বাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
তিনি দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে একদিন মক্কায় পৌছালেন। হজ শেষ করে মদিনা জিয়ারত করে গেলেন মিশরে। তিনি মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক জ্ঞান সঞ্চয় করলেন। জ্ঞান বিতরণও করলেন। মিশর থেকে ইরাক তুরস্ক হয়ে গেলেন পিতৃপুরুষের দেশ ইরানে। সেখানে একটানা কয়েক বছর থেকে ইন্ডিয়ার লখনোতে ফিরে এলেন।
কয়েক বছর লখনো শহরে থাকার পর হাজী মোহাম্মদ মহসীন বোন মন্নুজানের শারীরিক মানসিক অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে হুগলীতে ফিরে আসেন। তখন দু’জনেই প্রায় বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছেছেন। মন্নুজান তার বিশাল সম্পত্তি ভাই মহসীনকে বুঝিয়ে দিয়ে নিজে সম্পত্তির দায়–দায়িত্ব ও ঝামেলা থেকে মুক্তি নিলেন। কয়েক বছর পর মহসীন অন্তপ্রাণ মন্নুজান ৮৫ বছর বয়সে মারা যান। হাজী মোহাম্মদ মহসীন বোনের বিশাল সম্পত্তি সুচারুরূপে রক্ষণাবেক্ষণ ও তার আয়কৃত অর্থে বিভিন্ন মানবকল্যাণমূলক কাজে মনোনিবেশ করলেন।
মোহাম্মদ মহসীনের দানশীলতা ও মহানুবতা
তিনি গরিব–দুখি ও অসহায় মানুষদের দুঃখ–কষ্ট কিভাবে দূর করা যায় তা ভাবতেন অন্তর দিয়ে। হাজী মোহাম্মদ তার পৈতৃক সব সম্পত্তি এবং বোনের সমুদয় সম্পত্তি এক করে একটা দানপত্রের মাধ্যমে জনকল্যাণে ও ধর্মীয় কাজে ব্যয় করার জন্য দান করে দিয়ে কপর্দক শূন্য হয়ে গেলেন। এমন দৃষ্টান্ত সত্যি বিরল। ঠিক হলো তিনি জীবিতকাল পর্যন্ত এই সম্পত্তির আয় থেকে মাসে মাত্র একশত টাকা করে ভাতা নেবেন।
শিক্ষানুরাগী এ দানবীর তার অর্থ দিয়ে বহু বিদ্যাপিঠ স্থাপন করে গেছেন। হুগলিতে ‘হুগলি মহসিন কলেজ’ ও ‘চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ’ প্রতিষ্ঠার সময় মহসিনের ওয়াকফকৃত অর্থ ব্যবহৃত হয়। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে ‘দৌলতপুর মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। ১৭৬৯-৭০ সালের সরকারি দলিল অনুযায়ী তৎকালীন দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অনেক লঙ্গরখানা স্থাপন করেন এবং সরকারি তহবিলে অর্থ সহায়তা প্রদান করেন।
১৮০৬ সালে তিনি ‘মহসিন ফান্ড নামক তহবিল প্রতিষ্ঠা করেন। এ তহবিল ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, পেনশন, বৃত্তি ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দ করা হয়। ইতিহাসে দাতা হাজী মুহাম্মদ মহসিনের নাম চিরস্মরণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের নাম তার স্মরণে রাখা হয়েছে। এছাড়াও মহসিন ফান্ডের অর্থে অসংখ্য দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাটির নাম বিএনএস হাজী মহসিন।
মোহাম্মদ মহসীনের মৃত্যু
১৮০৬ সালে দানপত্রটি সম্পাদিত হয়। দানশীল মহামতি হাজী মোহাম্মদ মহসীন এরপর আর সাড়ে ছ’বছর জীবিত ছিলেন। তিনি ১৮১২ খ্রীস্টাব্দের ২৯ শে নভেম্বর ৮২ বছর বয়সে হুগলিতে ইন্তেকাল করেন। তাকে হুগলির ইমাম বাড়ায় দাফন করা হয়। তার দানশীলতার কাহিনী কিংবদন্তী আকারে ছড়িয়ে আছে এই উপমহাদেশে। শিক্ষানুরাগী হাজী মোহাম্মদ মহসীন ইতিহাসে দানবীর হিসাবে অমর হয়ে থাকবেন চিরদিন।
ইউডি/অনিক

