বিপিএল ২০২২: দেশের ক্রিকেটের প্রাপ্তি কি ?
আসাদুজ্জামান সুপ্ত । মঙ্গলবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৬:২৫
বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দেই পর্দা নামলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আয়োজনে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ২০২২-এর (বিপিএল)। এবারের আসরের শুরুতেই দল নির্বাচন ও ফ্রাঞ্চাইজি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিলো। বেশ ক’টি ফ্রাঞ্চাইজি এবারের আসর থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিসিবির সঙ্গে কথায় না মেলা কেউবা আর্থিক ক্ষতি বিবেচনায় দল গড়তে চায় নি। তবুও বিসিবি ছয়টি দল নিয়ে প্লেয়ার্স ড্রাফটের মাধ্যমে বিপিএল-এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে কার্যক্রম এগিয়ে নেয়। তবে শুরুতেই হোঁচট খায় ঢাকার ফ্রাঞ্চাইজির মালিকানা যারা নিয়েছিলেন তারা প্লেয়ার্স ড্রাফট থেকে নাম সরিয়ে নেন। বিসিবি নিজেরাই দল গোছান সেই ঢাকার। যদিও পরবর্তীতে মিনিস্টার গ্রুপ বিসিবি থেকে ঢাকা দল নিয়ে নেন। আর মৌসুম শেষে একটা হ য ব র ল পারফরম্যান্স দেয় অগোছানো দল ঢাকা। ক্রিকেট যে শুধু নামকা ওয়াস্তের খেলা না সেটাই প্রমাণ করে এবারের বিপিএলের দলগুলোর পারফরম্যান্স।
প্রথমেই আয়োজন নিয়ে বলি- বিপিএল একটা সময়ে ইন্ডিয়ার আইপিএলের পরেই নিজের স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু হতশ্রী আয়োজনের কারনে দিনে দিনে তা নিচেই নামতে থাকে। বর্তমানে বৈশ্বিক টি-টোয়েন্টির ফ্রাঞ্চাইজি আসরগুলোর মধ্যে তলানিতেই থাকবে এই লীগ। কেননা আসরে নেই কোনো বড় পারফরমার। বেশ কিছু উইন্ডিজ তারকা বিপিএলে অংশ নিলেও তাদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এছাড়া আসরের দু-চারটি বড় নাম এসেছে, তা স্বাভাবিক ভাবেই ফ্যাঞ্চাইজি মালিকদের নিজেদের আহ্বানে দল গড়ার কারন বৈকি আর কিছুই নয়।
এবার আসি প্রচার-প্রচারণা। বিপিএলের ছিলো না কোনো আমুদে প্রচার-প্রচারণা। আর টেলিভিশন সম্প্রচার তো যাচ্ছেতাই অবস্থা। ছিলো না ডিআরএস প্রযুক্তি। আসরের চট্টগ্রাম পর্ব থেকে ডিআরএসের পরিবর্তে সবার সম্মতিক্রমে নিয়ে আসা হয় এডিআরএস প্রযুক্তির। তবে সেটা কতটা নির্ভুল তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এবারের আসরেও ছিলো না কোনো তারকা আম্পায়ার, ধারাভাষ্যকার। যদিও আয়োজকদের কাছে বড় সমাধান মহামারি করোনা। সেটা যদিও যৌক্তিক এক কারন বটে। করোনার প্রভাবে যেভাবে আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়া দরকার ছিলো তা বিসিবি করতে পারে নি। নানা জটিলতা থেকে অনেক কিছুই সম্ভব হয়ে উঠে নি। তবে তারা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে আয়োজন সাজালে হয়তো এর থেকেও উন্নতি করা সম্ভব হতো।
এবার আসি অংশগ্রহণ করা ৬ দল নিয়ে। প্রথমেই বরিশালের কথা বলি। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকেই যেনো পুরো দলের হর্তকর্তা বানিয়ে নেন ফরচুন গ্রুপ। আর সেই ফলাফলও তারা পেয়েছেন পুরো আসরে। খালেদ মাহমুদ সুজনের কোচিং ও সাকিবের চমকপ্রদ দল গোছানোতে ভর করে নজর কেড়েছে এই দলটি। এই দল থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট কি পেল তা হচ্ছে ভবিষ্যতের একজন ওপেনার মুনিম শাহরিয়ার। এছাড়াও পেয়েছে পেসার রানা ও স্পিনার নাহিদুলকে। তাদেরকে ভালো পরিচর্যা করতে পারলে দেশের হয়ে ভালো সার্ভিস দিতে পারবে তারা। এছাড়াও সাকিবের ক্যাপ্টেন্সিও দেখেছে দেশ।
এরপর আসি কুমিল্লার দিকে। বিপিএলের যদি আন্তর্জাতিক মানের কোনো দল থেকে থাকে তবে সেটা একবাক্যে বলাই যায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কথা। এই দলের প্লেয়ার নির্বাচন ও মাঠের ক্রিকেট পুরোটাই থাকে আন্তর্জাতিক ছোঁয়া। এবারও তার কমতি ছিলো না। প্রোটিয়া তারকা ফাফ ডু প্লেসি, ইংলিশ তারকা মঈন আলী ও উইন্ডিজ সুনিল নারাইনকে নিয়ে দল সাজানো এই ফ্যাঞ্চাইজিতে দেশীয় তারকাদেরও মেলা ছিলো। মুস্তাফিজ-লিটন-ইমরুল। তবে উদিয়মান স্পিনার তানভীর আলো ছড়িয়েছেন পুরো আসর জুড়েই।
সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স। একেবারেই নবীন দল সাজিয়ে সবাইকেই চমকে দেয় আকতার গ্রুপ। জাতীয় দলের আফিফ, মিরাজ, মৃত্যুঞ্জয়, শরীফুল, শামীম, নাসুমসহ খেলেছেন আনকোরা বিদেশী জ্যাক উইলস, কেনার লুইস, চ্যাডউইক ওয়ালটন ও বেনি হাওয়েল। আর এমন দল নিয়েই তৃতীয় অবস্থানে থেকে আসর শেষ করে তারা। দেশের ক্রিকেট এই ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে একটি দারুণ পেস জুটি পেয়েছে শরীফুল ও মৃত্যুঞ্জয়।
খুলনা টাইগার্স পুরো আসরে ছিলো উচুঁ-নিচু অবস্থানে। কখনো-কখনো তারা বেশ ভালো করেছে কখনো দাপট হাড়িয়েছে। দলের পারফরম্যান্সে ইয়াসীর আলী রাব্বিকে খুঁজে পাওয়া গেছে বেশ। আর সিলেট আর ঢাকা ফ্যাঞ্চাইজি বিপিএলে আহামরি পারফরম্যান্স করতে পারে নি। তবে ঢাকার ওপেনার তামিম ইকবালের ৪০০ এর ওপর রান টি-টোয়েন্টিতে জাতীয় দলের শুধু আক্ষেপই ছড়িয়েছে। কেননা নিজ সিদ্ধান্তে তিনি আগামী ৬ মাসের জন্য জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়েছেন। বিপিএলে তার এমন পারফরম্যান্স আমাদের জাতীয় দলের ওপেনারদের কি শিক্ষা তা বলাই বাহুল্য।
লেখক: ক্রীড়া বিশ্লেষক

