নির্ভিক কলম যোদ্ধা কবি শামসুর রাহমান
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:১০
কবি শামসুর রাহমান বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে দুই বাংলায় তার শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত। বাংলা সাহিত্যে তাকে ‘স্বাধীনতার কবি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা বিরোধী বিষয়েও অবদান রাখেন তিনি। কবি শামসুর রাহমান একাধারে কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক, কলামিস্ট, অনুবাদক ও গীতিকার। নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত লিখেছেন সাইফুল অনিক।
জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা
বাংলাদেশের সমকালের কবিগনের মধ্য তাকে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ‘মজলুম আদিব’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। কবি ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। কবির পৈত্রিক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। কবিরা ভাই বোন ১৩ জন, কবি ৪র্থ।
শামসুর রাহমান ১৯৪৫ সালে পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে। শেষ পর্যন্ত আর মূলপরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
পেশা
শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান (স্বাধীনতার পরে দৈনিক বাংলা) এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে এরশাদের সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে ‘মূলধারা’ ও ‘অধুনা’ নামে দুটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
সাহিত্যধারা
বিংশ শতকের তিরিশের দশকের পাঁচ মহান কবির পর তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রসিদ্ধ। কেবল বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ এবং পশ্চিমবঙ্গের কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বিংশ শতকের শেষার্ধে তুলনীয় কাব্যপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বলে ধারণা করা হয়। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে আঠার বছর বয়সে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। আধুনিক কবিতার সাথে পরিচয় ও আন্তর্জাতিক-আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটে ১৯৪৯ সালে। তখন তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা মুদ্রিত হয় সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায়। শামসুর রাহমান বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে নানা ছন্দনাম নিয়েছেন। যেগুলো হচ্ছে: সিন্দবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক।
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশ পায় ১৯৬০ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটি’তে (১৯৬৩) এবং পরবর্তীতে ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরত’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দি শিবির থেকে’সহ তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৪৮টি, চারটি উপন্যাস, দুইটি গল্প সমগ্র, দুইটি কলাম, পাঁচটি অনুবাদ কবিতা, দুইটি অনুবাদ নাটক, একটি জীবনী, ১০টি শিশুতোষ গ্রন্থসহ মোট ৯৮টি বই প্রকাশ পায়।
প্রতিবাদী কবি
শামসুর রাহমান স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ১৯৫৮ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল (পত্রিকা) পত্রিকায় লেখেন ‘হাতির শুঁড়’ নামক কবিতা। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে তখন তাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন অসাধারণ কবিতা ‘টেলেমেকাস’। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেন। শামসুর রাহমান তখন সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান-এ কর্মরত থাকা অবস্থায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে মারাত্মক আলোড়িত হন শামসুর রাহমান এবং তিনি লিখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। ১৯৭০ সালের ২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিদুর্গত দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ও মৃত্যুতে কাতর কবি লেখেন ‘আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে’ নামক কবিতা । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে চলে যান নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন যুদ্ধের ধ্বংসলীলায়আক্রান্ত ও বেদনামথিত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’।
শামসুর রাহমান ১৯৮৭ সালে এরশাদের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে প্রথম বছরে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, দ্বিতীয় বছরে ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’, তৃতীয় বছরে ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ এবং চতুর্থ বছরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ লেখেন । ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর লেখেন ‘গণতন্ত্রের পক্ষে কবিতা’। শামসুর রাহমানের বিরুদ্ধে বারবার বিতর্ক তুলেছে মৌলবাদীরা। তাকে হত্যার জন্য বাসায় হামলা করেছে। এতকিছুর পরও কবি তার বিশ্বাসের জায়াগায় ছিলেন অনড়।
সম্মাননা ও পুরস্কার
কবি তার বর্ণাঢ্য খ্যাতিময় জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরষ্কার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, মিতসুবিসি পুরস্কার (সাংবাদিতার জন্য), স্বাধীনতা পদক, ইন্ডিয়া আনন্দ পুরস্কার ইত্যাদি। এছাড়া ইন্ডিয়ার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করেছে।
মৃত্যু
কবি ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী বনানী কবরস্থানে, নিজ মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। বাঙালি জাতি ও স্বত্বা স্বাধীনতার কবিকে স্মরণে রাখবে যুগ যুগ।
ইউডি/অনিক

