বিশ্বের নাম্বার ওয়ান খলনায়ক!

বিশ্বের নাম্বার ওয়ান খলনায়ক!

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ দশম দিনে গড়িয়েছে। দু পক্ষের দ্বিতীয় দফা আলোচনাতেও কোন সমঝোতা হয়নি। বিশ্বের সবর্ত্র থেকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়লেও তা বিন্দু পরিমান আমলে নিচ্ছেন না দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শুধুমাত্র রাষ্ট্রগুলোই নয় এ যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার দিকে চোখ তুলেছে বিভিন্ন সংস্থা-টেক জায়ান্টরাও। তাতে এ মুহূর্তে বিশ্বের এক নম্বর খলনায়ক বনে গেছেন পুতিন। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিসমাপ্তি সহসা ঘটছে না। ইতোমধ্যে ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো ধরণের সমঝোতায় আসছে না দুপক্ষের কেউই। রাশিয়া শনিবার দুটি শহরে সাময়িক যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা দিলেও অভিযোগ উঠেছে তারা সেখানে অনবরত গোলাবর্ষণ করেই যাচ্ছে। রাশিয়ার এমন কর্মকান্ডে নিন্দার ঝড় উঠেছে সমগ্র বিশ্বেই। গত বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের জরুরি অধিবেশনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। ১৯৩ সদস্য দেশের পরিষদে ওই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে ১৪১ দেশ এবং বিপক্ষে ভোট পড়েছে রাশিয়াসহ পাঁচ দেশের। এ প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল বাংলাদেশসহ ৩৫টি দেশ। তাতে এটা স্পষ্ট যে রাশিয়ার এই সামরিক অভিযানকে কেউই সমর্থন করছে না। আর প্রেসিডেন্ট পুতিনের এ ধরণের অভিযান ঘৃণিত এবং নিন্দনীয় বলে মত দিচ্ছেন সবাই।

আলোচনায় আগ্রহী জেলেনস্কি তবুও পুতিনের না: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অবশ্য বলেছে যুদ্ধ বন্ধ করতে তিনি সরাসরি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনা করতে চান। যদিও রাশিয়ানদের তরফ থেকে এ বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া আসেনি। পুতিন শুধু বলেছেন ইউক্রেনে সাফল্য অর্জনই তার লক্ষ্য। পুতিন বলেছেন ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে যোগদান থেকে বিরত রাখা ও দেশটিকে একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করাই তার লক্ষ্য।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি


পালান নি কিয়েভেই আছেন জেলেনস্কি: এদিকে, গুঞ্জন উঠেছিল দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এমন গুঞ্জন উড়িয়ে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি রাজধানী কিয়েভেই আছেন। নিজের ইনস্টাগ্রামে পেজে এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, দুই দিন পরপর তথ্য আসছে আমি কোথাও পালিয়ে গেছি। ইউক্রেনে, কিয়েভ এবং আমরা অফিসেও নেই। আমিও এখনও আমার জায়গায় আছি। আন্দ্রি বোরিসোভিড (ইয়ারমাক) এখানে। কেউ কোথাও পালিয়ে যাইনি। এখানে, আমরা কাজ করছি।
দুই শহরে খন্ডকালীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা: ইউক্রেনের সমুদ্র-তীরবর্তী দুই শহর মারিউপোল ও ভোলনোভখা’র বেসামরিক লোকজনকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে খন্ডকালীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে রাশিয়া। বেলারুশে রুশ ও ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র। শনিবার মস্কোতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেন, আজ ৫ মার্চ মস্কোর স্থানীয় সময় বেলা ১০টা থেকে খন্ডকালীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের মারিউপোল ও ভোলনোভখা’র বাসিন্দারা যেন নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন, সেজন্যেই এই যুদ্ধবিরতি দেওয়া হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর আক্রমণ


সমঝোতার চিন্তা না করলে ভবিষ্যত অন্ধকার:
বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ বন্ধের দাবি জোরালো হলেও তার দিকে নজর নেই কোন পক্ষেরই। বরং একদিকে কিয়েভের দিকে অগ্রসর হচ্ছে রুশ বাহিনী আবার অন্যদিকে ন্যাটো জোট ও আমেরিকার মিত্রদের ব্যাপক সহায়তায় তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ইউক্রেনীয়রা। যদিও রাশিয়ার সাথে তার শক্তির পার্থক্য অনেক বেশি। কিন্তু ইউক্রেন একা যুদ্ধ করছে না। তারা ন্যাটো জোট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা নিয়ে যুদ্ধ করছে। পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে রাশিয়া ও ইউক্রেন এর সাথে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তির হিসেব কেমন দাঁড়ায় তার ওপর। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ বন্ধ করতে আপোষ বা সমঝোতার চিন্তা কোন পক্ষই এখনো করছে না। পরিস্থিতি তাতে ভয়াবহতার দিকে মোড় নিবে। সামরিক জোট ন্যাটো সনদ অনুযায়ী জোটের কোন একটি দেশে সামরিক হুমকি এলে সবাই সহযোগিতা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সে কারণে ন্যাটোভুক্ত কোন দেশে রাশিয়া হামলা করলে তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। আবার বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিলো। এছাড়া রোমানিয়া ও পোল্যান্ডও রাশিয়ার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত। সে কারণে অনেকেই মনে করেন যে যদি যুদ্ধ সম্প্রসারিত হয় তাহলে এ তিন রাষ্ট্রেই বেশি ।

নিষেধাজ্ঞা বাড়ছেই তুবও টনক নড়ছে না: ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বহু দেশ ও সংস্থা। তারা বলছে পুতিন সোভিয়েত সাম্রাজ্য ফিরে পেতে চান। চলমান যুদ্ধে রাশিয়াকে ঠেকাতে ইউক্রেনকে ব্যাপক সামরিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্ররা। চারিদিক থেকে এত প্রকার নিষেধাজ্ঞা পেয়েও টনক নড়ছে না রাশিয়ার। ইতোমধ্যে টেক জায়ান্টরাও জেগে বসেছেন। রাশিয়া থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলো বাণিজ্য গুটিয়ে নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে। তারাও রাশিয়ারও ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও নিষেধাজ্ঞার দিকে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সবদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে পুরো বিশ্বই রাশিয়ার প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছে। তাতে বিন্দুমাত্র কান দিচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট পুতিন। তিনি নতুন কোনো কিছুর আশায়ই সম্ভবত অপেক্ষা করছেন।

একঘরে করার চেয়ে অনেক বড় রাশিয়া: রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন বলেছে, ইউক্রেনে অভিযানের ঘটনায় রাশিয়ায় সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে পশ্চিমারা দস্যুর মতো আচরণ করছে। কিন্তু একঘরে করার চেয়ে অনেক বড় রাশিয়া। শুধু আমেরিকা ও ইউরোপের চেয়ে বিশ্ব অনেক বড়। শনিবার ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এমন অভিযোগ করেন। পেসকভ বলেছেন, পশ্চিমারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক দস্যুতায় লিপ্ত এবং মস্কো এর জবাব দেবে। নির্দিষ্টভাবে কেমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা না জানালেও তিনি বলেছেন এগুলো হবে রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ওয়াশিংটন ও মস্কোর সংলাপের জন্য পথ এখনও উন্মুক্ত:
পশ্চিমারা রাশিয়া, রুশ নেতা পুতিন ও তার ঘনিষ্ঠজনদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পেসকভ উল্লেখ করেছেন, ওয়াশিংটন ও মস্কোর সংলাপের জন্য পথ এখনও উন্মুক্ত। আমেরিকা যদি রাশিয়া তেল ও গ্যাস রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাহলে তা বিশ্বের জ্বালানির বাজারে উল্লেখযোগ্য জটিলতা তৈরি করবে। ক্রেমলিন মুখপাত্র বলেছেন, একদিন বিদেশি কোম্পানিগুলো রাশিয়া পুনরায় ফিরে আসবে। যদিও তখন তারা দেখবে তাদের স্থান অন্যরা দখল করে ফেলেছে। রাশিয়া বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। হ্যাঁ, আকর্ষণীয় বিনিয়োগের কথা বলার জন্য এখন কঠিন সময়। কিন্তু সময় দ্রুত পাল্টায়।

ঝুঁকি নিয়েছেন পুতিন, শেষটা কোথায়:
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি রাশিয়াতেও যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেরই আশংকা যে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দেশটিতে সংকট আরও তীব্র হবে এবং বাড়বে জন-অসন্তোষ। প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। এটা কমাতে হয়তো সামরিক শাসন জারি করতে পারেন। এটি হলে মানবাধিকারকে সংকুচিত করার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু ধরুন মানুষ কথা বললো না, কিন্তু মানুষের পকেটে যখন টান পড়বে সেটা কিভাবে সামলানো হবে তা বলা মুশকিল। অদূর ভবিষ্যতে দু’দিক থেকে গণ-অসন্তোষের বড় ঢেউ আসলে, সেটা চাপা দেয়া যাবে না। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন পুতিন যদি ইউক্রেনে সাফল্যও পান, তার পরেও দেশটির চার কোটিরও বেশি মানুষের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে তাকে এবং তার ঢেউ রাশিয়াতে আসলে, সেটিও তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। ইউক্রেন যুদ্ধ বিলম্বিত হলে বা দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর মধ্য থেকেও বিদ্রোহের আশংকাও তৈরি হতে পারে। পুতিন ২০০০ সালে ক্ষমতার আসার পর থেকে সবসময়ই অলিগার্ক বা রাশিয়ান ধনকুবেরদের সমর্থন পাচ্ছেন। ২০১৮ সালে ছয় বছর মেয়াদের জন্য পুন:নির্বাচিত হওয়া পুতিনের মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হলেও সাংবিধানিক সংস্কারের কারণে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত তার দেশটির ক্ষমতায় থাকার সুযোগ আছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমারা তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের হুমকিও দিচ্ছেন, যার ভিত্তিগুলোর একটি হচ্ছে- রাশিয়াতেই তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা শক্ত বিরোধিতা। আবার সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর থেকে রাশিয়ার বহু বিত্তবান মানুষ ইউরোপ আমেরিকার সাথে নানাভাবে যোগ সূত্র তৈরি করেছে। ফুটবল ক্লাব থেকে শুরু করে নানা কিছুতে বড় বড় বিনিয়োগও আছে তাদের। এখন এগুলোর কী হবে তা নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন। আবার অনেকে পশ্চিমা দেশগুলোতে হরদম আসা যাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেটিও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্ধ হয়ে যাবে।

‘মার্শাল ল’ জারির কোনও পরিকল্পনা নেই: পুতিন বলেছেন, এই মুহূর্তে ‘মার্শাল ল’ জারির কোনও ইচ্ছা তার নেই। ইউক্রেনে রুশ হামলার দশম দিন শনিবার একথা বলেন তিনি। রাশিয়ার পতাকাবাহী এয়ারলাইন অ্যারোফ্লোটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শনিবার বৈঠক করেন পুতিন। বৈঠকটিতে রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। পুতিন বলেন, যখন বাইরের আগ্রাসন থাকবে তখন কেবল ‘মার্শাল ল’ জারি করা হবে। এই মুহূর্তে আমরা তেমন কিছুর মুখোমুখি নই। আমি আশা করি হতে হবে না।

বিশ্বের ইতিহাসে নতুন করে লেখা হবে পুতিনের নাম: বিশ্লেষকরা বলছেন যুদ্ধকে একটি কৌশল হিসেবে নিয়েছেন পুতিন। তার এ কৌশল পুরো বিশ্বকেই একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে নিয়ে যাবে। শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়, এটা পুরো পশ্চিমা বিশ্বের জন্য পুতিনের সতর্কবার্তা যে তার লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সরে আসবেন না। অবশ্যই এর ব্যাপক গুরুত্ব আছে। এটা কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ নয়। কারণ এটা যুদ্ধ গড়িয়েছে। আর এ যুদ্ধে যদি পুতিন যদি জিতে যায় তবে বিশ্বের ইতিহাসে নতুন করে লেখা হবে পুতিনের নাম।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading