পুরান ঢাকা: আধুনিকায়নে প্রয়োজন সঠিক কর্মপরিকল্পনা
ইমরাজ করিম । মঙ্গলবার, ৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪০
রাজধানী ঢাকা বিশ্বের বড় শহরগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আজ সাজতে শুরু করেছে আধুনিত ঢঙে। নতুন নতুন ফ্লাইওভার, উঁচু ও আধুনিক ডিজাইনের বিল্ডিং, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ঢাকা যেনো নতুনত্বের জানান দিচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো দিক দেখছে পুরান ঢাকা। হ্যাঁ, ঢাকার আদি অংশ। যা ঢাকাকে ‘ঢাকা’ হিসেবে এখনও পরিচয় দিতে বদ্ধ পরিকর।
চারশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী শহর পুরান ঢাকা এখন নানান সমস্যার জর্জরিত। অপরিকল্পিত নগরায়ন, সরু রাস্তা, ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ, ঘনবসতিসহ বিবিধ কারণে বসবাসে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে পুরান ঢাকা। নাগরিক সুবিধা বলতে কিছুই নেই এখানে। এ অবস্থায় পুরান ঢাকাকে আধুনিক শহরে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখাচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ। তবে এতে বাধাও রয়েছে পাহাড়সম। পুরান ঢাকাকে আধুনিক শহরে রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজন সঠিক কর্মপরিকল্পনা। পুরান ঢাকার অন্যতম সমস্যাগুলো হচ্ছে— জরাজীর্ণ ভবন, অপর্যাপ্ত রোড নেটওয়ার্ক, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ, অপর্যাপ্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত নাগরিক উন্মুক্ত স্থান, উচ্চ ঘনত্ব, নিম্নমানের জীবনযাপন, ভূমিকম্প ও অগ্নি দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
পুরান ঢাকার বিস্তৃতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আটটি থানার ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে। লালবাগ, আরমানিটোলা, সুত্রাপুর, জালুয়া নগর, হাজারীবাগ, লালবাগ, চকবাজার, সদরঘাট, কোতোয়ালি, বানিয়ানগর, বাবুবাজার, ওয়ারী, বেগমবাজার, বংশাল রোড, ধোলাইখাল, গেন্ডারিয়া, পোস্তা, বংশাল, শাঁখারী বাজার, গোয়ালনগর, লক্ষ্মীবাজার, তাঁতিবাজার, বাংলাবাজার, সুতারনগর ও পাটুয়াটুলীই মূলত এর অংশ। নাগরিক সুবিধাহীন হাজারো সমস্যায় জর্জরিত এসব এলাকা।
পুরান ঢাকার এলাকাগুলোতে আদর্শ মানদণ্ডের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জনবসতি রয়েছে। একটি আদর্শ আবাসিক এলাকায় প্রতি একরে ১২০ জনকে সমর্থন করা হয়। কিন্তু এই এলাকায় প্রতি একরে ২২৭ জন থেকে শুরু করে এক হাজার ৩৭৯ জন পর্যন্ত বসবাস করছে, যা আগামী ১০ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে গড়ে এই এলাকায় প্রতি একরে ৪২০ জন করে বসবাস করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরান ঢাকার উন্নয়নের জন্য অবশ্যই ব্লকভিত্তিক পদ্ধতিতে আসতে হবে। পৃথিবীর অনেক শহরে এমন নজির রয়েছে। তবে এতে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি শহরের নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। চাইলেই পুরান ঢাকাকে সিঙ্গাপুর বা কুয়ালামপুর করা যাবে না। তবে একে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পুনঃউন্নয়ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি স্থাপনার নিজস্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে পুনঃউন্নয়ন করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, প্রকল্পভুক্ত জনসাধারণের মতামত ও চাহিদার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বিদ্যমানভবন ও অবকাঠামোগুলোর পুনঃনির্মাণ, পুনর্বিন্যাস ও কাঠামোগত হালনাগাদ, রাস্তা প্রশস্তকরণ ও পরিকল্পিত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। এছাড়া ভূমিকম্প, অগ্নি দুর্ঘটনাসহ অনান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা, পর্যাপ্ত গাছপালাযুক্ত পার্ক, খেলার মাঠসহ খোলা জায়গা সৃষ্টি হবে।
পৃথিবীর অনেক দেশ আরবান রিডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে তাদের শহরগুলোকে পুনঃউন্নয়নের আওতায় এনেছে। অনেক ঘন বসতিপূর্ণ শহরে তা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যেসব দেশ আরবান রিডেভেলপমেন্ট প্রকল্প নিয়ে সফল হয়েছে তার মধ্যে সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম।
তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আশার আলোর পাশাপাশি বেশকিছু চ্যালেঞ্চও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পলিসি বিষয়ক সিদ্ধান্ত, কমিউনিটির ওপর নির্ভরশীলতা, প্রাথমিক আর্থিক তহবিল, আইনি কাঠামো, প্রাথমিক পুনর্বাসন, ডেভেলপারদের বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক উন্নয়নে অবদান ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন রয়েছে।
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো অক্ষুন্ন রেখে একে নাগরিকদের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেই হিসেবে অনেকটাই পিছিয়ে আছে এই শহর। তাই দ্রুত যথাযথ কৃর্তপক্ষের মাধ্যমে সঠিক কর্মপরিকল্পনা করেই পুরান ঢাকাকে আধুনিকায়ন করতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
ইউডি/অনিক

