নারী নির্যাতন ও সহিংসতার অবসান কবে?
আবিহা স্বর্ণা । বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:২৮
জাতিসংঘ সদর দফতরে ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেনের (সিএসডব্লিউ) ৬১তম সেশনে কান্ট্রি স্টেটমেন্ট পর্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি বাংলাদেশের নারীর অগ্রযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব ও নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে তাঁর সাফল্যগাঁথার চিত্র তুলে ধরেন। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ প্রণয়ন, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন, দুঃস্থ নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তৃণমূলে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত নানা উদ্যোগ এবং গত ক’বছরে ১ লক্ষ ৭০ হাজার নারীর বৈদেশিক কর্মসংস্থানের কথা বলেন। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে রোল মডেল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইউএন উইমেনের প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়নশীপ অ্যাওয়ার্ড ও গ্লোবাল পার্টনার ফোরামের ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির কথাও তিনি সকলকে মনে করিয়ে দেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এমডিজির অর্জিত সাফল্য বাংলাদেশকে ২০৩০ এর আগেই এসডিজি ৫-এর লিঙ্গ সমতা বাস্তবায়নে সাহায্য করবে।
আমরা নারী উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি সাফল্যকে অভিনন্দিত করি। কিন্তু এ উন্নয়নের সুফল যারা ভোগ করবে তারা যদি স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দময় জীবনের অধিকার বঞ্চিত হয়, ঘরে-ঘরে পদে-পদে যদি নির্যাতনআতঙ্ক তাদের বিড়ম্বিত জীবনের কারণ হয়, কী হবে এই উন্নয়ন দিয়ে? একটি মাত্র জীবন আমাদের! সবকিছু এ-জীবনের জন্যই তো!
ধর্ষণকে পতিতাবৃত্তির সমবয়সী এক সামাজিক সমস্যা বলা যায়। ধর্ষণ একালে এসে সংঘবব্ধ ধর্ষণে রূপ নিয়েছে এবং পরিকল্পিত নানা ঘটনার মতো ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। জন্মদিনের বা অন্য কোনো উপলক্ষের বাতাবরণে ধর্ষণের ঘটনা আমরা দেখেছি। বিয়ে বাড়িতে বন্ধুর বোন বা প্রেমিকাকে বন্ধবীসহ দাওয়াত দেওয়া হয়। শরবতের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে তাদের ঘুমের বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয় পরিকল্পিত স্থানে। তারপর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের খবর অহরহ আসছে পত্র-পত্রিকায়।
বর্ষবরণের দিনে পড়ন্ত বেলায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল কিছু যুবতী মেয়ে। এ ঘটনার পর পর জার্মানির কোলন শহরে ঐতিহ্যবাহী কার্নিভালের সংবাদ সিএনএনের সহযোগী একটি টিভি চ্যানেলের পক্ষে সরাসরি প্রচার কার্যের দায়িত্বে থাকা এক নারী সাংবাদিককে যৌন হয়রানি করতে দেখেছেন দর্শকেরা। দুদিক থেকে দুজন নির্যাতনকারীর আচরণে বিব্রত, বিক্ষুব্ধ, দুঃখী ও অসহায় সে নারী সাংবাদিকের ছবি দেখে সবাই স্তম্ভিত। বিশ্ববাসীর সঙ্গে আমরা ভেবেছি আমরা তবে কোন ছাড়? কার্নিভাল উৎসবের সেই ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে, ভাষ্য সে দেশের পুলিশের। ভন্ড-পীর-ফকির-পুরোহিতের আস্তানায় দিনের পর দিন নির্যাতিত হচ্ছে কিশোরী-তরুণীরা। পিতা-মাতার অসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস এক্ষেত্রে কিশোরীদের নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়েই চলে। কেরালার পেট্টা এলাকায় শয্যাগত স্বামীর জন্য মেয়ের উপর পূজার ভার দিয়ে মা ব্যস্ত ছিলেন সংসার চালাতে। দিনের পর দিন ভন্ড সাধুর নির্যাতনে অতিষ্ট মেয়েটি সুযোগ বুঝে ধারালো ছুরিতে সাধুর লিঙ্গ কর্তন করে। তরুণীর এই সাহসিকতাকে সমর্থন করেছে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে মামলা হয়েছে সাধুর বিরুদ্ধে, তরুণীর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আনা হয়নি। আমরা নির্যাতিতার প্রতি এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধুবাদ জানাই।
কমলা ভাসিনের সব কথা আমরা মানি না। তিনি যখন বলেন ঘর থেকে বেরুলেই নারীর উপর সহিংসতা কমবে সুতরাং বেরিয়ে পড় নারী। যখন যেখানে খুশি, যেভাবে খুশি। আমরা এটা চাইব না।
আমরা নারী নির্যাতনের ক্রমভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা রূপ দেখে নিজেদের মধ্যে কুঁকড়ে যাচ্ছি। নারী-শিশু পাচার ও দেহব্যবসার কাজে তাদের বাধ্য করার গল্প আমাদের দেশেও প্রচুর হয়েছে। নেপালেও এদের রমরমা ব্যবসার খবর নতুন নয়। জানা যায়, পাচারকৃত নেপালি নারীদের অজ্ঞান করে গায়ের চামড়া নাকি খুলে নেওয়া হচ্ছে। এই চামড়া ল্যাবে প্রক্রিয়াজাতকরণের পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের নানা দেশে যাচ্ছে। কসমেটিক সার্জারির কাজে ব্যবহৃত ও চামড়া প্রতি ২০ বর্গ ইঞ্চি ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ধরনের খবর আমরা শুনতে চাই না। আমরা নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতার অবসান চাই।
লেখক: অনলাইন উদ্যোক্তা

