সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সময়ের দাবি

সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সময়ের দাবি

রুকাইয়া মিজান মিমি । মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:০২

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরশীলতা। একটা সময় কাগজ-কলমে তথ্য সংরক্ষণ; সরাসরি যোগাযোগ, কেনাকাটা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চলমান থাকলেও, আজ তা চলছে ইন্টারনেট সেবার আওতায়। এতে করে শ্রমের লাঘব, সময়ের অপচয় রোধ আর কাজে গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সাইবার অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ইন্টারনেটে তথ্য সংরক্ষণ জনজীবনকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাইবার অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ আজ কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই এ অপরাধচক্রকে দমন করতে ২০১৫ সালে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন এবং ২০১৮ সালের ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করেছে। তবু সাম্প্রতিক সময়ের দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, এই অপরাধের মাত্রা কমছে না বরং উত্তরোত্তর বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেট্রো পুলিশ বিভাগের তথ্যানুসারে, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজার ডিজিটাল অপরাধ-সংক্রান্ত অভিযোগপত্র জমা পড়ে। এছাড়াও ঢাকায় ২০২০ সালে সাইবার অপরাধজনিত মামলার সংখ্যা ছিল ৪৫৮টি, যা ২০২১ সালে ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৬১টি হয়েছে। এ চিত্র কেবল ঢাকাতেই নয়, সমগ্র দেশজুড়েই বিস্তৃত। যা বেশ উদ্বেগজনক!

সাইবার অপরাধের মধ্যে অপপ্রচার, গুজব ছড়ানো, ব্যক্তির মানহানিকর তথ্য প্রদর্শন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, আইডি হ্যাক, ভুয়া অ্যাকাউন্ট চালনা, ব্ল্যাকমেল, ডিজিটাল প্রতারণা, আপত্তিকর ছবি/ভিডিও ভাইরাল, অনলাইনে জঙ্গিবাদের প্রচারণা উল্লেখযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ভুক্তভোগীদের অনেকে মানসম্মান রক্ষার্থে, সঠিক বিচার প্রাপ্তির অনিশ্চিয়তায় এবং সাইবার আইন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাবে আইনের শরণাপন্ন হন না। কখনো-বা তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, এমনকি আত্মহত্যাতেও প্রলুব্ধ হন।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে সাইবার ক্রাইম। আর এ অপরাধের শিকার হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ার্নেস ফাউন্ডেশনের’ তথ্যমতে, সাইবার অপরাধে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী মেয়েরা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১৮ বছরের কম ১০.৫২ শতাংশ, ১৮ থেকে ৩০ বছরের কম ৭৩.৭১ শতাংশ। এছাড়াও ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে এ অপরাধের শিকার ১২.৭৭ শতাংশ নারী জনগোষ্ঠী।

দৈনন্দিন জীবনে এই সাইবার অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে জনগণের উদাসীনতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, উল্লেখযোগ্য শাস্তি প্রদানে স্বল্পতা, পুলিশ বিভাগে দক্ষ জনবলের ঘাটতি, শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেটে অবাধ ব্যবহার, ভুক্তভোগী চুপ থাকার মানসিকতা, অতিমাত্রায় অনলাইনে আসক্তি ও প্রলোভনের জড়িয়ে পড়াসহ বেশ কিছু কারণ জড়িয়ে আছে। তাই সাইবার অপরাধ দমনে শুরুতেই পুলিশ বিভাগে উন্নত প্রযুক্তি জ্ঞানসংবলিত দক্ষ জনশক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সাইবারক্রাইম মনিটরিংয়ে ল্যাব কার্যক্রম ও অন্যান্য যে সব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সঠিক বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকে নিশ্চিত করা জরুরি। অপরিণত বয়সে শিশু-কিশোরদের হাতে দামি ডিভাইস প্রদান থেকে অভিভাবক শ্রেণিকেও সজাগ হতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন আইডি ব্যবহারকারীদেরকে জটিল ও কঠিন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে। সেই সঙ্গে অনলাইনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার না করা এবং সন্দেহজনক পরিস্হিতিকে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

এছাড়াও, পরিস্হিতি মোকাবিলায় ভুক্তভোগীর যথাসময়ে আইনের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন ব্যাপক পরিমাণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। সমাজের অনেকেই সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগীকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টায় মিডিয়ায় বিজ্ঞপ্তি প্রদান, গণমাধ্যমে তথ্য সম্প্রচার করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা যায়। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্ম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও বিভিন্ন ওয়ার্কশপের আয়োজন করে এর মোকাবিলায় অংশ নিতে পারে। সর্বোপরি, সবার সঠিক তদারকি ও সাইবার আইনের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তির এ যুগে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে আনা আজ সময়ের দাবি।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading