গতিশীল, শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তোলার লক্ষে: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ক্যাপিটাল মার্কেট কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল গঠন করুন
শেখফারুক । মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৪২
দেশের শেয়ার মার্কেট বা পুঁজিবাজার নিয়ে উদ্বেগ-উতকন্ঠা যেন কাটছে।ঙ্গত কয়েক মাস যাবত কোনভাবেই দরপতনের চক্র থেকে বেরুতে পারছে না। প্রফেসর ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডিএসই), চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ কমিশন (সিএসই) সহ পুঁজিবাজার (ক্যাপিটাল মার্কেট) সংশ্লিষ্ট সকলের চেষ্টা তদবিরের পরেও তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা সত্বেও বাজারের “খামখেয়ালী” আচরণ ও ক্রমাগত পতনের ধারা এখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করে চলেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশ আর্থিক ভাবে ভয়াবহ রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অনেকে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসার অবস্থা। মাঝেমধ্যে দু/একটি কার্যদিবসে সূচকের উত্থান ঘটলেও সেই আশার আলোটুকু হারিয়ে যাচ্ছে পতনের অতলে। একটু ঘুরে দাঁড়ালেও কোনভাবেই ধারাবাহিকতা থাকছে না।
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার সূচকের যে উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে তা গত কয়েক মাস ধরে ক্রমাগতভাবে সূচকের যে পতন হয়েছে, বাজার যে মূল্য হারিয়েছে, বিনিয়োগকারীরা যে তাদের পুঁজি হারিয়েছে সেই তুলনায় এটা অতি নগণ্য, সামান্য। এটা সমুদ্রে থাকা কয়েক ফোঁটা জল মাত্র। এই উত্থানে খুশি হওয়ার তেমন কিছু নেই। তবে এটা মাঝ মাঝে বিনিয়োগকারীদের আশা দেখাচ্ছে।
এরমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি গত ৮ মার্চ একটি সার্কুলার জারি করে পাবলিক এবং ব্লক মার্কেটে সার্কিট ব্রেকারে পরিবর্তন এনে ধসের কবল থেকে মার্কেটকে কিছুটা রক্ষা করেছে। নতুন নিয়মে পরবর্তী নির্দেশ না-দেয়া একটি শেয়ারের মূল্য ১০ শতাংশ বাড়তে পারবে। অর্থ্যাত্, একটি শেয়ার তার আগের দিনের ক্লোজিং-প্রাইস (সমাপনী মূল্যের) ১০ শতাংশ বেশি দিয়ে ক্রয় করা যাবে। অন্যদিকে বিক্রি বা ক্রয় আদেশের ক্ষেত্রে সমাপনী মূল্যের সর্বোচ্চ ২ শতাংশ কমে করা যাবে। এমনকি মার্কেট চলাকালীন সময়ে সর্বশেষ বিক্রিত মূল্যের ২ শতাংশ বিক্রি বা ক্রয় আদেশ অফার করা যাবে। সাময়িক ভাবে হলেও বিএসইসি’র এই উদ্যোগটি সময়োচিত। এই উদ্যোগের জন্য বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। এজন্য ড. শিবলী কমিশনকে ধন্যবাদ।
কিন্তু এগুলো বাজারের অস্থায়ী উদ্যোগ। বাজারকে সবসময় এভাবে বেঁধে রাখা যায় না। অতীতেও এ ধরণের ফ্লোর প্রাইজ করে বাজারকে সাময়িকভাবে রক্ষা করা হয়েছে। পরবর্তীতে তা উঠিয়ে নেয়াও হয়েছে। তাতক্ষণিক ভাবে কিছু সুফল মিললেও এ ধরনের সাময়িক ও অস্থায়ী উদ্যোগকে ভিত্তি করে বাজার শক্তিশালী ভাবে টিকে থাকতে পারে না।
গত ৯ মার্চ দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সিএফও-দের উপস্থিতিতে বিএসইসি’র উদ্যোগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তগুলোও মার্কেটের জন্য ইতিবাচক হয়েছে। বিএসইসি’র কমিশনার প্রফেসর ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় তিনটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রথমতঃ ক্যাপিটাল মার্কেটে ব্যাংকের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ যে সীমা (মূলধনের২৫%)-র নিচে যে সব ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে তারা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কমপক্ষে ২% বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে।
দ্বিতীয়তঃ ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজারের/সীমার বাইরে পুজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলো প্রত্যেকে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের অনুমতি রয়েছে। যে সব ব্যাংক এখনও ওই তহবিল গঠন করেনি তারা দ্রুত সেটা গঠন করবে এবং যারা গঠন করেছে তারা সবাই মিলে পুঁজিবাজারকে সহায়তা করার জন্য যতটুকু বিনিয়োগ করা সম্ভব এরা দ্রুত বিনিয়োগ করবে।
তৃতীয়তঃ টায়ার-১ ক্যাপিটাল ও টায়ার-২ ক্যাপিটাল হিসেবে যেসব ব্যাংক পারপেচুয়াল বন্ড ও সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ইস্যুর জন্য কমিশনে আবেদন করবে সেগুলো দ্রুত প্রসেসে করে দেওয়া হবে এবং ব্যাংকের অন্য যেসব ক্যাপিটাল রেইজিং প্রসেসের সাথে জড়িত সেই সব কার্যক্রমও সার্বিকভাবে বিএসইসি সহায়তা করবে।

যদি ব্যাংকগুলো আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করে তাহলে এ কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, এই তিনটা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে এবং পারপেচুয়াল বন্ড ও সাব-অর্ডিনেট বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ব্যাংকের যদি মূলধন বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো মূলধনের ২৫% বিনিয়োগ করতে পারবে যেটা বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়াবে। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ করার সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়বে এবং তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়বে। যা পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অনেক সহায়ক হবে।
এছাড়া গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিনিয়োগ-সীমা সহ কতক বিষয়ে ‘স্পষ্টীকরণের’ উদ্দেশ্যে একটি সার্কুলার জারি করেছে। ওই সার্কুলারের দুটো বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সার্কুলারে বলা একটি বিষয় হচ্ছে, “নিজস্ব সাবসিডিয়ারি কোম্পানি বা কোম্পানিগুলোর প্রদত্ত ইক্যুয়িটি দীর্ঘমেয়াদি ইক্যুয়িটি বিনিয়োগ/ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি (বিডি) লিমিটেড স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর শেয়ার ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে না”। এই বিষয়টি নিয়ে অনেকদিন যাবত অস্পষ্টতা ছিল। দীর্ঘদিন পরে এটা পরিস্কার ব্যাখ্যা পাওয়ার কারণে অন্ততঃ একটি বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর হয়েছে।
সার্কুলারে আরও একটি বিষয়ে বলা হয়েছে, “আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগসংক্রান্ত বিবরণী এখন দিতে হবে প্রতি ত্রৈমাস শেষ হবার পর (তিন মাস পরপর)”। গত বছরের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তথ্য প্রথমে প্রতিদিন/দৈনিক ভিত্তিতে এবং পরে সংশোধন করে মাসিক ভিত্তিতে দেয়ার নির্দেশ দেয়। নতুন সার্কুলারে সেটা পরিবর্তন করা হয়েছে। এটা মার্কেটে একটু সুবিধা তৈরী করেছে। বিশেষভাবে কৌশলী বিনিয়োগের তিন মাসের একটা বড় স্পেস তৈরী হয়েছে।
কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে মোট বিনিয়োগ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে “বাজার-মূল্য”কে ভিত্তি মূল্য ধরা হয়েছে যেটা মার্কেট সংশ্লিষ্টরা কোনভাবেই সমর্থণ করছে না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত বিনিয়োগ-সীমার ভিত্তি-মূল্যকে বাজার-মূল্যের পরিবর্তে ক্রয়-মূল্য নির্ধারণ করা জরুরী। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে কিরেন, “বাজার-মূল্যে”র পরিবর্তে ‘ক্রয়-মূল্যে”কে ভিত্তি মূল্য ধরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসাবায়নের কোন বিকল্প নেই। এটা মেনে নেয়াই উত্তম।

পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ পর্যালোচনার উপরের তথ্যগুলো তুলে ধরার কারণ হচ্ছে, শেয়ার মার্কেটের স্বার্থে অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়া সত্বেও মার্কেট শক্তিশালী হচ্ছে না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। গুজব ছড়ানো, প্যানিক সৃষ্টি করা, ম্যানুপুলেশন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্যাম্বলিং, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা সহ অনেক কারণ মুখে মুখে ঘুরছে। তাছাড়া সংশ্লিষ্টদের ভূল-ভ্রান্তি, ত্রুটি, দূর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, অনিয়ম, নীতিহীনতা মত এন্তার অভিযোগ রয়েছে। তারপরও একথা অনস্বীকার্য যে, পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য ড. শিবলী নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন নানা ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশেষভাবে একথা বলা প্রয়োজন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি শক্তিশালী ও গতিশীল শেয়ার মার্কেট গড়ে তোলার জন্য খুবই আন্তরিক। বহুবার প্রমাণ হয়েছে, তিনি বিনিয়োগ বান্ধব। বিনিয়োগকারীদের কল্যাণের জন্য তিনি যথেষ্ট উদার ও আন্তরিক।
আবার উল্লেখ করতে চাই, এরপরও কেন পুঁজিবাজার আশানুরুপভাবে শক্তিশালী ও অতিশীল নয়? আমার মতে, আর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ের অভাব। কোন কোন ক্ষেত্রে সততা ঘাটতি রয়েছে। আরও রয়েছে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদারকির দূর্বলতা। তবে সমন্বয়হীনতা যেন সবচেয়ে প্রকট।
একথা অনস্বীকার্য যে, সমৃদ্ধ দেশ গঠনের লক্ষে অর্থনৈতিক উন্নতির বিকল্প নেই। এজন্য গতিশীল, শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তোলা খুবই জরুরী। সকল ধরনের সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে “ক্যাপিটাল মার্কেট কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল” বা একটি সমন্বয় ফোরাম গড়ে তোলা দরকার। এটা সময়ের দাবি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই’র সকল স্টেক-হোল্ডার এবং বিনিয়োগকারীদের নিয়ে এটা গঠন করতে হবে।
এই ক্যাপিটাল মার্কেট কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের প্রধান উপদেষ্টা/প্যাট্রন হবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএসইসি’র পাশাপাশি ওই কাউন্সিলে থাকবেন সকল শটেক-হোল্ডারদের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের অংশীদারিত্ব। সম্ভাব্য যারা থাকবেন, অর্থ মন্ত্রী, শিল্প মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রী, অর্থ সচিব, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিএসই, সিএসই, শেয়ার মার্কেটে লিস্টেড কোম্পানী প্রতিনিধি, ব্রোকারেজ হাউজ/ট্রেক লাইসেন্সধারীদের প্রতিনিধি, মার্চেন্ট ব্যাংক প্রতিনিধি, এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি, মার্কেট মুভার প্রতিনিধি, ব্যাংক/লিজিং/ফাইনান্স/আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ইন্সুরেন্স মালিক প্রতিনিধি, ব্যাংক/লিজিং/ফাইনান্স/আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ইন্সুরেন্স প্রধান নির্বাহীদের প্রতিনিধি, ব্যাংক/লিজিং/ফাইনান্স/আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ইন্সুরেন্স সিএফও প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি সহ সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণ।
প্রস্তাবিত ওই কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বা সমন্বয় ফোরামের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের উন্নতি, সমৃদ্ধি ও বিকাশে্র লক্ষে ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সকল নীতিমালা প্রনয়ন এবং কর্মপন্থা ও কৌশল নির্ধারণ করা হলে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল পুজিবাজার গড়ে ওঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

