মাটিদূষণ রোধে সচেতন হতে হবে এখনই
ধরিত্রী সরকার সবুজ । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:০৭
মানুষসহ সব প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য ভূমি বা মাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মাটিতে জন্মানো উদ্ভিদ থেকেই আমরা খাদ্য পাই। মাটির ওপরের স্তরের উৎকর্ষের ওপর মাটির উর্বরতা ও উদ্ভিদের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে। আবার আমাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের কারণেই মাটির বিভিন্ন উপাদান নষ্ট হচ্ছে। কখনো মাটির মধ্যে দূষিত পদার্থ মিশে যাচ্ছে, মাটির ক্ষয় হচ্ছে, মরুময়তার বিস্তার হচ্ছে, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে বা মাটির গুণাগুণ হ্রাস পাওয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটছে। মাটির ওপরের পুষ্টি উপাদান হ্রাস পাচ্ছে, মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধিকারী জীবাণুর জীবনধারণে ব্যাঘাত ঘটছে। এর ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। এখনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে একসময় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগল। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ল। জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে এবং ফসলের অধিক ফলন পাওয়ার জন্য রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে কীটনাশকের ওপর কৃষকের নির্ভরশীলতা বেড়েছে অনেক। জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের পরিবর্তে অহরহ ব্যবহৃত হচ্ছে এসব রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। ক্ষেতের ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করার সঙ্গে সঙ্গে মাটির জন্য উপকারী কীটপতঙ্গকেও ধ্বংস করে ফেলছে এসব কীটনাশক।
আবার কখনো কখনো ইটখোলাগুলো ইট তৈরির জন্য মাটি কিনে নেয়। কৃষিজমির মালিক একটি ফসল উঠে যাওয়ার পর অনেক সময় নগদ অর্থের প্রয়োজনে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করে দেন। কিন্তু এতে ভূমির উর্বরাশক্তি কমে যায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে ফসল উৎপাদন দারুণভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে। মূলত ফসলি জমির উপরিস্তরের ৭ থেকে ১০ ইঞ্চির মধ্যে জৈব উপাদান এবং খাদ্য গুণাগুণ থাকে। জমির উর্বরাশক্তির জন্য এ স্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জমির মালিক এ স্তরের মাটি বিক্রি করে দিলে ফসলের উৎপাদন অনেক কমে যায়। আবার একবার ফসলি জমির মাটি কাটা হলে তার উর্বরাশক্তি ফিরে আসতে ৮-৯ বছর সময় লেগে যায়।
দেশে শিল্পায়ন বাড়ছে। নানা ধরনের শিল্প-কারখানা স্থাপিত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। শিল্প-কারখানায় প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে বর্জ্য পদার্থ। শিল্প-কারখানার বর্জ্যগুলোর সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা খুব জরুরি। কিন্তু অনেক সময়ই সেটি করা হচ্ছে না। বরং অনেক সময় শিল্প-কারখানার কঠিন ও তরল বর্জ্য পার্শ্ববর্তী উন্মুক্ত মাঠ, বনজঙ্গল বা নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে শিল্প-কারখানার রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণের ফলে ওই সব স্থানের মাটি ব্যাপকভাবে দূষিত হচ্ছে। এর ফলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর নানা ধরনের রোগব্যাধির সৃষ্টি হতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার মাধ্যমে সিসা, দস্তা, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি বিষাক্ত ধাতব পদার্থ ভূমিতে বা মাটিতে মিশে যাচ্ছে। গাড়ির ব্যাটারি, টায়ারের মতো দ্রব্যাদি ব্যবহার শেষে যখন বর্জ্য পদার্থে পরিণত হয়, তখন এসব বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এগুলোর একটি অংশ মাটিতে মিশে যাচ্ছে। এসব বিষাক্ত ধাতব পদার্থ মাটির গুণাগুণ মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে। সার্বিকভাবে অতিরিক্ত পশুচারণ, খনিজ পদার্থ উত্তোলন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের অভাব, ভূমির জৈব পদার্থের হ্রাস মাটিদূষণের কারণ ঘটাচ্ছে।
আমরা একটু সচেতন হলে মাটিদূষণ অনেকটা কমিয়ে আনা যায় বা প্রতিরোধ করা যায়। শহর-নগরের গৃহস্থালি এবং শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত কঠিন ও তরল বর্জ্য পদার্থ যত্রতত্র ফেলে না দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে মাটিদূষণ হ্রাস করা যায়। কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে এবং রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে তা মাটিকে সুস্থ রাখার জন্য সহায়ক হবে। বেশি করে গাছের চারা রোপণ ও বনায়ন কার্যক্রম মাটিদূষণ রোধ করতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।
তবে বায়ুদূষণ ও পানিদূষণ নিয়ে আমরা যতটা সরব, ভূমিদূষণ বা মাটিদূষণ নিয়ে ততটা উচ্চকণ্ঠ নই। কিন্তু এ ধরিত্রীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য রাখতে হলে প্রথমেই ভালো রাখতে হবে মাটিকে। এ পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটি দূষণমুক্ত রাখব—এ প্রত্যয় নিয়ে হোক আমাদের পথচলা।
লেখক: পরিবেশ বিষয়ক লেখক

