সৈয়দ মুজতবা আলী: রসাত্মবোধক রচনায় জুড়ি নেই তার
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:১৫
দুই বাংলার স্বতন্ত্র নিজস্ব এই সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চা যাদের হাত ধরে বেঁচে থাকে তারা হলেন এই দুই অঞ্চলের রুচিশীল সংস্কৃতিবান মানুষ। এদের মধ্যেই কিছু উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক বাংলার সংস্কৃতি চর্চার আকাশ আলোকিত করেছেন যুগে যুগে। তেমনি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কগুলির মধ্যে অন্যতম একজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও রম্যরচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম
| তার বিশেষ উক্তি – “জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর” “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে প্রিয়ার কালোচোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বই খানা অনন্ত যৌবনা..” “বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না” প্রভৃতি |
সৈয়দ মুজতবা আলী: সৈয়দ মুজতবা আলী একজন বিংশ শতকী বাঙালি সাহিত্যিক। কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেন তিনি। মুজতবা আলী তার ভ্রমণকাহিনির জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা একই সঙ্গে পাণ্ডিত্য এবং রম্যবোধে পরিপুষ্ট। তিনি ছিলেন বহুভাষাবিদ, তার পান্ডিত্যগুণে এবং সার্থক রম্যরচনাকার হিসাবে উতকৃষ্ট প্রশংসার দাবী রাখেন পাঠকমহলে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম: সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯০৪ সালের ১৩ ই সেপ্টেম্বর তৎকালীন আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে জন্ম গ্রহন করেন। তাদের আদি নিবাস ছিল শ্রীহট্টে। এই শ্রীহট্ট জেলা বর্তমানে সিলেট। সৈয়দ মুজতবা আলীর পিতা খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সাব রেজিস্ট্রারের চাকরি করতেন। এই আলী পরিবারের পৈতৃক নিবাস ছিল হবিগঞ্জের উত্তরসুর গ্রামে।
বর্ণময় শিক্ষাজীবন: সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষাজীবন অত্যন্ত বর্ণময়। জীবনের শুরুতে ছেলেবেলায় তিনি তার জন্মস্থান সিলেটেরই একটি সরকারি হাই স্কুলে নিজের শিক্ষা জীবন শুরু করেন। এইখানে সৈয়দ মুজতবা আলী নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। পিতা সরকারের অধীনস্থ উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসেবে বদলির চাকরি করার কারণে তার এর পরবর্তী শিক্ষাজীবন কেটেছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তৎকালীন সময়ে বিশ্বভারতীর স্নাতক ডিগ্রী দেশের অন্য কোথাও গৃহীত না হওয়ার কারণে সৈয়দ মুজতবা আলী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আই.এ শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ১৯২৯ সাল নাগাদ হুমবোল্ট বৃত্তি নিয়ে জার্মানি গিয়ে বার্লিন এবং বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৩২ সালে দর্শন বিভাগের তুলনামূলক ধর্মশাস্ত্রে গবেষণা করে সৈয়দ মুজতবা আলী লাভ করেন ডি.ফিল ডিগ্রী। সকল প্রকার পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী এবং মেধাবী সৈয়দ মুস্তাফা আলী এরপর ১৯৩৪ সাল নাগাদ মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর কর্মজীবন: শিক্ষা জীবনের মতই সৈয়দ মুজতবা আলীর কর্মজীবনও ছিল বর্ণময়। তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন ১৯২৭ সালে বর্তমান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের কৃষি বিজ্ঞান কলেজের ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে সৈয়দ মুজতবা আলী সেখানকার শিক্ষা দপ্তরের একজন অধিকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পঞ্চাশের দশকে কিছুদিন আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন পাটনা, কটক, কলকাতা এবং দিল্লিতে। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তন করেন। বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অবসরগ্রহণ করেন।
সাহিত্যকর্ম ও অন্যান্য সৃষ্টি: বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য পথিকৃত হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলী সাহিত্যিকের পাশাপাশি ছিলেন অনুবাদক তথা বহুভাষাবিদ। আপন মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি তিনি ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান, আরবি, সংস্কৃত, উর্দু ইত্যাদি আরো ১৪ টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা চলাকালীন ‘বিশ্বভারতী’ ম্যাগাজিন পত্রিকায় তার বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়। সত্যযুগ, বসুমতী, শনিবারের চিঠি, কালান্তর, মোহাম্মদী এরকম বেশ কিছু পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তিনি সত্যপীর, ওমর খৈয়াম, টেকচাঁদ, রায়পিথোরা, প্রিয়দর্শী এমন বহু ছদ্মনামে লিখতেন। সাহিত্যে জগতে তার প্রথম প্রবেশ ‘দেশে বিদেশে’ (১৯৪৯) গ্রন্থটি লিখে। এটিই তাকে সাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। আফগানিস্তানের স্মৃতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, দর্শনীয় স্থান, সাধারণ মানুষের জীবন অসাধারণ গদ্য রসে মহীমময় হয়ে উঠেছে। তার এই গ্রন্থটিকে ভ্রমণকাহিনী আবার একই সাথে রম্যরচনাও বলা চলে।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে– দেশে বিদেশে, জলে-ডাঙ্গায়, পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকন্ঠী, চাচা কাহিনী, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, ধূপছায়া, দ্বন্দ্বমধুর, চতুরঙ্গ, শ্রেষ্ঠ গল্প, ভবঘুরে ও অন্যান্য, শ্রেষ্ঠ ররম্যরচনা, টুনিমেম, প্রেম, বড়বাবু, রাজা-উজির, হিটলার, কত না অশ্রুজল, মুশাফির।
সৈয়দ মুজতবা আলী, কাজী নজরুল ইসলামের যে গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন– রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম। ‘রসগোল্লা’ নামক গল্পের ঝাণ্ডুদা রসগোল্লা নিয়ে কোথায় ঝামেলায় পড়েছিলেন– ইতালির ভেনিস বন্দরে। তিনি চারখানি উপন্যাস লিখেছেন। যথা- অবিশ্বাস্য (১৯৫৩), শবনম (১৯৬১), শহর ইয়ার (১৯৬৯), তুলনাহীনা (১৯৭৪)।
মরণোত্তর একুশে পদক: জীবনের মহান কীর্তির জন্য জীবদ্দশায় তথা মৃত্যুর পরেও সৈয়দ মুজতবা আলী বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৪৯ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি নরসিংহ দাস পুরস্কার লাভ করেন। আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন ১৯৬১ সালে। এছাড়া, সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০৫ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর মৃত্যু: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭৪ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ৬৯ বছর বয়সে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজে বাংলা সংস্কৃতির উজ্জ্বল এই জ্যোতিষ্কের জীবনাবসান ঘটে। সরস, মার্জিত ও বুদ্ধিদীপ্ত সাহিত্য ধারার প্রবর্তক সৈয়দ মুজতবা আলী এখনও সমাদৃত পাঠকমহলে।

