টিভি সিরিয়াল থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের রাজা

টিভি সিরিয়াল থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের রাজা

কিফায়েত আহমেদ সুস্মিত । শনিবার, ১৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪০

আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অভিনেতা। যিনি নায়ক রাজ রাজ্জাক নামে সুপরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়ক রাজ উপাধি দিয়েছিলেন। নায়করাজ রাজ্জাক তার ক্যারিয়ারে প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

বাংলাদেশে আসা ও প্রাথমিক জীবন
ঢাকাই ছবির অহংকার, বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি সেই থেকেই আব্দুর রাজ্জাক কোটি দর্শকের মনে গেথে আছে নায়ক রাজ হিসাবে। নায়ক রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম তিনি কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে থাকাবস্থায় সরস্বতী পূজার সময়ে মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। এতে তার গেম-টিচার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে বেছে নেন নায়ক চরিত্রে। সে টিচারের শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা ‘বিদ্রোহী’ নামের একটি নাটকে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়করাজের অভিনয়ে পথচলা। এরপর রাজ্জাক ১৯৬৪ সালে স্বপরিবারে বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি। তারো আগে তিনি পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হন। ঢাকায় এসে রাজ্জাক ‘উজালা’ সিনেমায় পরিচালক কামাল আহমেদের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সঙ্গে সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর সালাউদ্দিন প্রোডাকশনের ‘১৩ নাম্বার ফেকু অস্তাগর লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার কাছে নিজ মেধার পরিচয় দেন। পরবর্তীতে ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরি স্টিশন’সহ আরো কয়েকটি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেন।

চলচ্চিত্রের মুকুট বনে যাওয়া
কঠোর পরিশ্রম আর জীবনের প্রতিটি মহুর্তের সাথে সংগ্রাম করে উপাধি পেয়েছেন আজকের এই নায়ক রাজ রাজ্জাক। তবে তিনি তৎকালীন(পাক) সময়েও দর্শকের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। আর এই জন প্রিয়তা অর্জন করেছেন পাকিস্তান টেলিভিলশনে ঘরোয়া নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। জীবনে নানা সংগ্রামের পথ অতিক্রম করে তিনি। তার পর আব্দুল জব্বার খানের সহযোগিতায় তিনি একবার ফিল্মে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। তিনি উজালা ছবিতে কাজ শুরু করেন পরিচালক কামাল আহমেদের সহকারী হিসাবে। এর পর সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের তেরো নাম্বার ফেকু অস্তাগড় লেন চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার কাছে নিজ মেধার পরিচয় দেন তিনি। পরবর্তীতে কার বউ,ডাক বাবু, আখেরী স্টেশন সহ আরও বেশ কটি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে তিনি এবং ১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে।
৬০-এর দশকের শেষ থেকে ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে জনপ্রিয়তার চূড়ায় ওঠেন রাজ্জাক। একে একে নায়ক হয়েছেন তিনশরও বেশি চলচ্চিত্রে। রাজ্জাক অভিনীত দর্শকনন্দিত সিনেমাগুলোর মধ্যে আছে রয়েছে ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘মধু মিলন’, ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘কী যে করি’, ‘অবুঝ মন’, ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অশিক্ষিত’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাদী থেকে বেগম’ ইত্যাদি। প্রায় ৩০০ সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেশ দাপটের সঙ্গেই ঢালিউডে সেরা নায়ক হয়ে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এর মধ্য দিয়েই তিনি অর্জন করেন নায়ক রাজ রাজ্জাক খেতাব। অর্জন করেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। এ ছাড়া রাজ্জাক জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন।
সিনেমা প্রযোজনাও করেছেন চিত্রনায়ক রাজ্জাক। প্রযোজক হিসেবে নায়ক রাজের যাত্রা শুরু ‘রংবাজ’ ছবিটি প্রযোজনার মধ্য দিয়ে। এটি পরিচালনা করেছিলেন জহিরুল হক। রাজ্জাকের বিপরীতে ছিলেন কবরী। ববিতার সঙ্গে জুটি বেঁধে নায়করাজ প্রথম নির্দেশনায় আসেন ‘অনন্ত প্রেম’ চলচ্চিত্র দিয়ে। এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। নায়ক হিসেবে এ অভিনেতার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল শফিকুর রহমান পরিচালিত ‘মালামতি’। এতে তার বিপরীতে ছিলেন নূতন।

নায়করাজ রাজ্জাক সর্বশেষ তার বড় ছেলে নায়ক বাপ্পারাজের নির্দেশনায় ‘কার্তুজ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এই চলচ্চিত্রে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়াত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামও অভিনয় করেছিলেন। চাষী নজরুল ইসলামের প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ সিনেমায়ও রাজ্জাক অভিনয় করেছিলেন। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে রাজ্জাক-সুচন্দা, রাজ্জাক-কবরী ও রাজ্জাক-শাবানা ও রাজ্জাক-ববিতার অনেক সিনেমা দর্শক হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং যা রাজ্জাককে ঢালিউডের নায়ক রাজ উপাধিতে ভূষিত করেছে। কাজের স্বকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার।

পুরস্কার ও সম্মাননা
এদিকে, শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে নায়করাজ ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পদক পুরস্কারে ভূষিত হন। শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন মোট পাঁচবার। তাছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান ২০১৩ সালে। ভূষিত হন বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায়।

মহা নায়কের প্রয়াণ
এরপর সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক।

হাইলাইট
সিনেমার নায়ক হওয়ার অদম্য স্বপ্ন ও ইচ্ছা নিয়ে রাজ্জাক মুম্বাইয়ের ফিল্মালয়ে সিনেমার ওপর পড়াশোনা ও ডিপ্লোমা করেন। এরপর কলকাতায় ফিরে এসে শিলালিপি ও আরও একটি সিনেমায় অভিনয় করেন। পরে ভাগ্যান্বেষণে ঢাকায় আসলে ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading