পবিত্র রমজান ও দ্রব্য মূল্য: কারসাজি রোধে এখনই সতর্কতা প্রয়োজন
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪৩
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। টিসিবি ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রি করলেও তা ভোক্তাদের জন্য অপ্রত্যুল। প্রধানমন্ত্রী স্বল্প আয়ের মানুষকে কম দামে পণ্য কিনতে এক কোটি বিশেষ কার্ড দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই সরকার বাজার নজরদারি শুরু করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভোজ্যতেল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমিয়েছে ১০ শতাংশ। শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনাই হয়, দ্রব্যমূল্যের উর্ধবগতি রোধে চাই ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছা। বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক
| মহামান্য রাষ্ট্রপতির আহ্বান ও প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগ যেন বিফলে না যায় |
সম্প্রতি দ্রব্যমূল্যের দাম জনগণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একের পর দাম বাড়ছে পণ্যের। বাজার মনিটরিং করেও বন্ধ হচ্ছে না অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। দেশে ভোজ্যতেলের সংকট না থাকলেও কৃত্তিম সংকটে দেশের বাজার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য দেশে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ সুবিধাটাই নিয়েছে দেশের কতিপয় ব্যবসায়ীরা। এদিকে, দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে তেল আমদানির পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকার বাজার মনিটরিং-এর পাশাপাশি ভোজ্যতেল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমিয়েছে ১০ শতাংশ।

দরিদ্র মানুষের সহায়তায় বিত্তবানদের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান: রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আসছে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষ্যে সমাজের দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তবে ভবিষ্যতে সংক্রমণ বৃদ্ধি রোধ করতে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আর কিছুদিন পরই আসছে পবিত্র রমজান মাস। এ উপলক্ষ্যে সমাজের দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে তিনি বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া শবেবরাত উপলক্ষে তিনি বলেন, পরম করুণাময় মহামারি ও সকল ধরনের সংঘাত-সংকট থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করুন। পবিত্র শবেবরাত সকলের জন্য রহমত, বরকত, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ বয়ে আনুক, মহান আল্লাহর দরবারে এ প্রার্থনা করি।
১ কোটি মানুষ পাবে বিশেষ কার্ড: স্বল্প আয়ের মানুষ যেন কম দামে পণ্য কিনতে পারে, সেজন্য এক কোটি মানুষকে সরকার বিশেষ কার্ড দেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারপ্রধান বলেছেন, আমরা টার্গেট করেছি, এক কোটি মানুষকে আমরা স্পেশাল কার্ড দেবো। যেটা দিয়ে তারা ন্যায্যমূল্যে জিনিস কিনতে পারবেন। যে ৩৮ লাখকে আমরা টাকা দিচ্ছি তারা তো থাকবেই, তার বাইরে আরও এক কোটি লোককে দেবো। তাছাড়া ৫০ লাখ মানুষকে একটি কার্ড দেওয়া আছে, যার মাধ্যমে তারা মাত্র ১০ টাকায় চাল কিনতে পারছেন। সরকারের কাছে যথেষ্ট খাদ্য মজুত আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন আমাদের খুব বেশি কিছু করার থাকে না। কিছু তো কম্প্রোমাইজ করতে হয়। কিন্তু রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। আলহামদুলিল্লাহ, এখনো ১৮ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য মজুত আছে আমাদের। সেখানে কোনো অসুবিধা নাই।
মূল্য বৃদ্ধি মনিটরিং করছে সরকার: মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক মন্দা ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে সরকার দেশের বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাজার মনিটরিং করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে একটা কথা এসেছে। দ্রব্যমূল্য কেবল বাংলাদেশে নয়, করোনাভাইরাসের কারণে সারাবিশ্বের অর্থনীতি মন্দা। যে কারণে আজকে পৃথিবীর সব দেশে সেই সুদুর আমেরিকা থেকে শুরু করে সবদেশের দ্রব্যমূল্য ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে এখানেও সে প্রভাবটা পড়ে, আর কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণি রয়েছে এই সুযোগটা নেয়ার জন্য।
তেল আমদানিতে ভ্যাট কমলো ১০ শতাংশ: ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে এবার পরিশোধিত-অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থাৎ ভোজ্যতেল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমেছে ১০ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ও খুচরা পর্যায়ে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত বুধবার (১৬ মার্চ) এনবিআর থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরিশোধিত-অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল এবং অন্যান্য পরিশোধিত পামওলিন তেলের ওপর আরোপণীয় মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হওয়া আদেশ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এর আগে গতকাল অর্থমন্ত্রণালয় থেকে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরবরাহ বেড়েছে ভোজ্যতেলের: দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে তেল আমদানির পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরেই চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল খালাসের নির্ধারিত ডলফিন জেটি ও রিভার মুরিং জেটিতে বিভিন্ন কোম্পানির তেল নিয়ে ভিড়ছে একের পর এক অয়েল ট্যাংকার। এর মধ্যে তেল আমদানি ও বাজারজাতকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপেরই আমদানি করা ১০ হাজার মেট্রিক টন তেল খালাস করে ফিরে গেছে এমটি প্যাসিফিক রুবী নামের একটি অয়েল ট্যাংকার। আগামী ২০ মার্চ সিটি গ্রুপের জন্য ১৫ হাজার মেট্রিক টন তেল নিয়ে আসবে অপর জাহাজ এমটি পাইওনিয়ার। এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন কোম্পানির ভোজ্যতেলের আমদানি বাড়ায় বাজারেও তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। বর্তমানে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
যুদ্ধকে দোষছে ব্যবসায়ীরা: পুরো বছর জুড়েই দফায় দফায় চক্রাকারে একেকবার একেকটি পণ্যের চাহিদা বেড়েই চলেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সীমিত ২/১জন কর্মকর্তা নিয়মিত বাজার তদারকি করেও এই নিত্যপণ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে পারছেন না। দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীদের অজুহাতের শেষ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে টানা ছয় মাস ধরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এখন যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ। ব্যবসায়ীরা প্রতিবছরই নানা কৌশলে আগেই দাম বাড়িয়ে দেন সংঘবদ্ধভাবে। আর রমজানে দাম বৃদ্ধি না পাওয়ায় অভিযোগ করারও সুযোগ থাকে না।
মূল্য বৃদ্ধিতে জনদূর্ভোগ: বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ভোগান্তি বেড়েছে নিম্ন -মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। চরম সংকটে পড়েছে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা। এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। টিসিবি ট্রাকের সামনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। তাদের কেউ কেউ দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। নিত্যপণ্যের জন্য দীর্ঘ লাইন এখন সচিবালয়ের ভিতরেও। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা টিসিবির পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সচিবালয়ের কর্মচারীদের মধ্যে টিসিবির পণ্য দেওয়া হচ্ছে রেশনিং পদ্ধতিতে কার্ডের মাধ্যমে।

টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানোর দাবি: ঢাকাসহ সারাদেশে ৪৫০টি পয়েন্টে এখন ট্রাকে করে টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছে৷ এর মধ্যে ঢাকা শহরসহ ঢাকা বিভাগে ১০১টি পয়েন্টে পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে৷ শুক্রবার বাদে সপ্তাহে প্রতিদিন প্রতিটি ট্রাকে দিনে ৬০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৪০০ কেজি ডাল, ৫০০ কেজি চিনি এবং ৫০০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে৷ একজন ক্রেতা সয়াবিন তেল দুই লিটার, চিনি ও মসুর ডাল দুই কেজি এবং পেঁয়াজ সর্বনিম্ন দুই কেজি থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি কিনতে পারেন৷ কিন্তু তাতেও দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে যেতে দেখা গেছে অনেককেই। তাতেই টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানোর দাবি উঠেছে। টিসিবি জানাচ্ছে, বর্তমান কার্যক্রমের পাশাপাশি রমজান মাসেও চলবে বিশেষ কর্মসূচী।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, টিসিবি ন্যায্যমূল্যের টিসিবি চার ধরনের ভোগ্যপণ্যের বিক্রি করছে। এখন নিন্মবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রাক থেকে পণ্য কিনছেন। কিন্তু টিসিবির কার্যক্রম বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমিত ও ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ। মোট চাহিদার মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ পূরণ করতে পারে টিসিবি। তবে টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগ আছে। এজন্য সরকারের অন্যান্য পদক্ষেপের সঙ্গে সমন্বয় করে টিসিবির কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
ব্যবসায়ীদের উচিত জনস্বার্থে সরকারের পাশে থাকা: কিছু দিন পরেই আসছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজান। পবিত্র মাসে যেন নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ভোগান্তিতে পড়তে না হয় সে দিকে ব্যবসায়ীদের নজর দেয়া আবশ্যক। পবিত্র মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ে কারসাজি কারওই কাম্য নয়। অনেক দেশে রমজান মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম মূল্যে কিংবা বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হয় উলটো। ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। আসছে রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের উচিত জনগনের স্বার্থে সরকারের পাশে থেকে মূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ: দরিদ্র ও হত-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রপতির আহ্বান ও প্রধানমন্ত্রী মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তাদের আহ্বান ও উদ্যোগ যেন বিফলে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সরকার দেশে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে প্রতিনিয়তই পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু জনগণের কথা চিন্তা করে ব্যবসায়ীদের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নানা অযুহাতে অনৈতিক ভাবে পণ্যের দাম বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকতে হবে। অবৈধভাবে মজুদ করে পণ্যের কৃত্তিম সংকট তৈরি করার হীনমানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে। অতি মুনাফার লালসা ত্যাগ করে হত দরিদ্রদের কথাও ভাবতে হবে ব্যবসায়ীদের। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ও স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পাশাপাশি এক হয়ে কাজ করতে হবে ব্যবসায়ীদের। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ালেও দেশের দরিদ্র জনগনের কথা চিন্তা করে সরকারি সহায়তা নিয়ে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। তাতেই দেশের বাজারে পণ্যের মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।

