২২ ‘দুর্বল’ ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছে
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
দেশে প্রতিনিয়তই বাড়ছে ব্যাংকের সংখ্যা। বর্তমানে এই সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৬১টিতে। এতগুলো ব্যাংকের মধ্যে হাতেগোনা কিছু ব্যাংক ভালোভাবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সিংহভাগের অবস্থা দুর্দশাগ্রস্ত। এমন অবস্থায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার চেষ্টাও চলছে। আমানতকারীদের জন্য নীতি-নির্ধারকদের এগিয়ে আসা উচিত এখনই বলছেন অর্থনীতিবিদগণ। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস
একটি ব্যাংকের পরিস্থিতি কতটা খারাপ হলে সেই ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত যেকোনও ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তা থেকেই স্পষ্ট দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় অতি সম্প্রতি পদ্মা ব্যাংকসহ বেশ ক’টি ব্যাংক নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-সহায়তায় কোনও রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এ ব্যাংকগুলো। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পরছেন আমানতকারীগণ। তারা শঙ্কায় আছেন এসব বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে। এসব ব্যাংকগুলোকে দুর্দশার হাত থেকে বাঁচাতে উদ্যোগ গ্রহণ করছে সরকার। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার প্রক্রিয়া চলছে।
দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার: সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে এই ব্যাংকগুলোকে টিকে থাকতে হলে মার্জার বা একীভূত করার প্রয়োজন হবে। এই অবস্থায় অর্থমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে দ্রুত ব্যাংকগুলোকে নিয়ে বসে আলোচনার মাধ্যমে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
দুর্নীতির কারণেই অবস্থা দুর্দশাগ্রস্ত: দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, একইভাবে বড় হয়েছে দেশের ব্যাংক খাতও। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, সরকারি- বেসরকারি এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ। কমে যাচ্ছে প্রকৃত আয়। এছাড়া ঝুঁকি মোকাবিলায় এই ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। সব মিলে দুর্নীতির চক্রে পড়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে ব্যাংক খাত। এর মধ্যে দুই বছর ধরে চলছে করোনার আঘাত। এতে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা আরও প্রকট হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত ডিসেম্বর প্রান্তিকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এসব জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তির দুর্বলতা প্রকাশ করে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি, তাদের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ও মূলধন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ওইসব ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশও ঘোষণা করতে পারে না। অপরদিকে, খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়।
২২ ব্যাংকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ২২টি ব্যাংকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, সাধারণত ৫ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণকে সহনীয় বলা হয়। ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি হলে তা উদ্বেগজনক মনে করা হয়। যদিও খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত তদারকি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি ৯টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। এছাড়া ১০ ব্যাংকের মূলধনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এই ব্যাংকগুলোতে বিদায়ী বছরজুড়ে নানা ছাড় দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুই-ই বেড়েছে।
করোনা কোনো কারন নয় আগে থেকেই দুর্বল ছিলো ব্যাংক খাত: এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেছে, করোনার আগে থেকেই বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দুর্বল ছিল। এখন ঝুঁকি আরও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানাভাবে ছাড় দেওয়ার পরও গত এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, আমানত কমেছে, টাকা তোলার হার বেড়েছে। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর আয় কমেছে, প্রণোদনার ঋণ নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে, ঋণ আদায় তলানিতে। বাড়েনি বিনিয়োগ সক্ষমতা।
একীভূতের পরামর্শ ছিল সাবেক ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীরও : সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল বাংলাদেশ ব্যাংককে দুর্বল হয়ে যাওয়া দু-একটি ব্যাংক একীভূতকরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ নিয়ে ২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীরের কাছে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে গভর্নরকে বলা হয়েছিল, দু-একটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ বিবেচনায় আনলে ভালো হবে। দেশে অচিরেই ব্যাংক সঞ্চয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আমার মনে হয়। সে জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় হয়তো হয়েছে। আমার এই পরামর্শ বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। শুধু সাবেক অর্থমন্ত্রী নয়, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বছরে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংক একীভূত করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে খসড়া হয়ে গেছে, সেটি আমরা সংসদে নিয়ে যাবো। সেখানে অনুমোদন দেওয়ার পর একীভূতকরণ কার্যক্রম শুরু হবে।
চার বছরেও গাইডলাইন তৈরি হয়নি: গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, মার্জার বিষয়ে একটি গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংক একীভূতকরণের একটি গাইডলাইন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত হবে কবে, এই প্রশ্ন অনেকের। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি এই গাইডলাইন তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, গাইডলাইনটি চূড়ান্ত করা হলে আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলো এটি অনুসরণ করে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে মার্জার বা একীভূত হতে পারবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এই গাইডলাইন প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে; কিন্তু এখন পর্যন্ত গাইডলাইনটি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে মত প্রকাশ করা হয় রাষ্ট্রীয় খাতের বৃহত্তম ব্যাংক সোনালী বাদে অন্যান্য ব্যাংক একীভূত করা যেতে পারে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে চারটি ব্যাংকের কথাও বলা হয়। ব্যাংকগুলো হলো, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক লিমিটেড। এ ক্ষেত্রে কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংককে একীভূত করার সুপারিশ করা হয়। এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের নেতৃত্বে একটি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অপর একটি কমিটি। তারা এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। সেটি নিয়ে এখন কাজ হচ্ছে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সার্কুলার জারি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হবে।
আইনেও একীভূতকরণের কথা বলা আছে: ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণের কথা বলা আছে ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ তেও। আইনের ৪৯(১) ধারায় বলা হয়, কোনও ব্যাংকের অনুরোধক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রস্তাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩-এর বিধান অনুযায়ীও বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণে সহায়তা করার ক্ষমতা রাখে। উভয় আইনের বিধান বাস্তবায়নে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূতকরণের জন্য ২০০৭ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আর্থিক খাতের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে নীতিমালাটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। গাইডলাইনস ফর মার্জার বা অ্যামালগামেশন অব ব্যাংকস বা ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস শীর্ষক এ নীতিমালায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
সুস্থ পরিবেশ ও সুশাসন ফিরিয়ে দ্রুত একীভূত করা উচিত: অর্থনীতিবিদগণ বলছেন, কখনও কখনও একীভূতকরণের বিষয়ে আলোচনা হয় বটে, কিন্তু যে ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কথা তাদের অনাগ্রহের পাশাপাশি যাকে একীভূত করার কথা, তাদের একীভূত না হওয়ার তদবির এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা মনে করেন, ব্যাংক খাতে সুস্থ পরিবেশ ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে অতি দ্রুত একীভূত করা উচিত।
সমস্যা দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সম্প্রতি বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকেই সমস্যা আছে। এটা এই খাতের রীতি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমস্যা তৈরি হলে দ্রুত সমাধান করা। তিনি বলেন, অনেকে বলে যে, আমাদের ব্যাংকে অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু আমি জানতে চাই, কোন দেশের ব্যাংকে সমস্যা নেই? ভারত ও চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশেও এই সমস্যা আছে। সমস্যা থাকা স্বাভাবিক। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমস্যা হলে দ্রুত তার সমাধান করে ফেলা, যেটা আমরা করছি।
সালমান এফ রহমান আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনেক সময় পরামর্শ আসে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো একীভূত করা হোক। এ সময় তিনি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং খাতের নতুন নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিষয়ে নিয়মিত খবর রাখার পরামর্শ দেন।

