আব্বাস উদ্দিন: পল্লীগীতি-ভাটিয়ালী সঙ্গীতের সম্রাট
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:২০
“তুমি সুরের পাখি আব্বাসের, দরদ ভরা সেই গান” লাইনটি কণ্ঠশিল্পী জেমসের একটি গান থেকে নেয়া। কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে যে যাদু ছিলো, তেমন জাদু আর কারো কণ্ঠে দেখা যায়নি। পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী গানের ক্ষেত্রে আব্বাসউদ্দিন যে খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেছিলেন, তা এক কথায় তুলনাহীন। ভাটিয়ালী ও পল্লীগীতির গায়ক হিসাবে ইতিহাসে আব্বাস উদ্দিন চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন। পল্লীগীতি ও ভাটিয়ালী সঙ্গীতের অমর কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দিনের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
সংক্ষেপে আব্বাস উদ্দিন
আব্বাস উদ্দিন ছিলেন একজন বাঙালি লোক সঙ্গীতশিল্লী, সঙ্গীত পরিচালক, ও সুরকার। আব্বাসউদ্দিন কোনো রাজসভার গায়ক ছিলেন না, তিনি বিভিন্ন সভায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে যেতেন। তিনি যে সভায় গান গাইতে যেতেন, সে সভায় যেন মানুষের ঢল নামতো। আব্বাস উদ্দিন সাধারণ মানুষ থেকে শহুরে মানুষ সবার প্রিয় অতিপ্রিয় গায়ক ছিলেন। নজরুলের ইসলামী ভাবধারার গানকেও তিনি জনপ্রিয় করেছিলেন।
অমর এই কণ্ঠশিল্পী ১৯০১ সালে ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার বলরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শৈশবে বলরামপুরে, কুচবিহারে এবং বাংলাদেশের রাজশাহীতে লেখাপড়া করেন। তার পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল। আব্বাসউদ্দিনের স্ত্রীর নাম লুৎফুন্নেসা। সঙ্গীতশিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী, ব্যারিস্টার মোস্তফা কামাল ও ফেরদৌসী রহমান আব্বাস উদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র ও কন্যা।
শৈশব থেকেই গান প্রীতি
শৈশব থেকেই গানে গানে তানে তানে পথ চলতেন আব্বাস উদ্দিন আহমদ। প্রচণ্ড এক ভালোবাসা ছিল তার গানের প্রতি। গানের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। সন্তানের গানের সুরে মুগ্ধ হন জাফর আলী আহমদ। আব্বাস উদ্দিন তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং পরে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর সংগীত চর্চাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে তার সাথে পরিচয় হয় কাজী নজরুল ইসলাম, ইন্দুবালা, জগত ঘটক, কাজী মোতাহার হোসেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আঙ্গুরবালা সহ অসংখ্য শিল্পীর সাথে। তিনি প্রথম জনসম্মুখে গান করেন তার শিক্ষাঙ্গনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।
আব্বাস উদ্দিনের সঙ্গীত সাধনা
কাজী নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’’ গানটি আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে মারাত্মক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলামের সহায়তায় কলকাতায় গিয়ে তিনি গ্রামাফোন রেকর্ডে গান করেন। তার রেকর্ডকরা গানের সংখ্যা প্রায় সাতশো । তিনিই লোকসঙ্গীতকে শহুরে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন।
তার প্রথম ও দ্বিতীয় রেকর্ডকরা গান যথাক্রমে কোন বিরহের নয়ন জলে /বাদল ঝরে গো, স্মরণ পারে ওগো প্রিয়/তোমার মাঝেই আপনহারা। আব্বাসউদ্দিনের কণ্ঠে লোকগীতির নানা রূপই খুবই সুখশ্রাব্য ও শ্রুতিমধুর হতো। ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, মুর্শিদী, দেহতত্ত্ব, বিচ্ছেদি, চা, ক্ষিরোল প্রভৃতি নানা শ্রেণীর অজস্র লোকগীতি গেয়েছেন তিনি। বিখ্যাত দোতারা বাদক কানাইলাল শীল আব্বাসউদ্দিনকে লোকগীতি প্রচারে ও প্রসারে বিশেষ সহায়তা করেন।
তারপর থেকে আর পেছনে ফেরা নয়। আব্বাস উদ্দিন ভাওয়াইয়াকে নিয়ে গেছেন অনেক দূর। দেশ থেকে দেশান্তরে। সেই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভায় গান গেয়ে বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। গাইতেন ‘ওঠরে চাষী জগতবাসী, ধর কষে লাঙল’। শুধু ভাওয়াইয়া গানই নয় তিনি বাংলা ইসলামী গানেরও শ্রষ্ঠা। এ ছাড়াও উর্দু, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব, মার্সিয়া, পালাগান গেয়েছেন।
কর্মজীবন ও বাংলাদেশে স্থায়ী নিবাস
আব্বাস উদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আব্বাস উদ্দিনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আব্বাস উদ্দিন আহমদ এর পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে আব্বাস উদ্দিন ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের দিনই ইন্ডিয়ার কোলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। ঢাকায় স্থায়ী হয়েই তিনি এ দেশের মানুষকে গানের দিকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে সংগীত চর্চা কেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক সমাবেশসহ নানা অনুষ্ঠানে ভাওয়াইয়াকে পৌঁছে দিয়েছেন ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন।
অভিনেতা ও লেখক
শুধু গানই নয় আব্বাসউদ্দিন আহমেদ মোট ৪টি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাগুলো হলো বিষ্ণুমায়া (১৯৩২), মহানিশা(১৯৩৬), একটি কথা এবং ঠিকাদার (১৯৪০)। এসব সিনেমাতে তিনি গানও করেছিলেন। তখনকার দিনে মুসলমান ব্যক্তির সিনেমা করা ছিল একটা ব্যতিক্রম ঘটনা। আব্বাস উদ্দীনের রচিত একমাত্র গ্রন্থ ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সংগীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স(১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার(১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে(১৯৮১) ভূষিত হন। এছাড়াও আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় তাকে বিভিন্ন সময় ভূষিত করা হয়।
ভাটিয়ালী সম্রাটের চিরবিদায়
১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর বুধবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে চিরবিদায় নেন সুরের পাখি তথা ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন।
ইউডি/অনিক

