রক্ষা হচ্ছে না হালদা নদীর প্রাণ
আয়েশা সিদ্দিকা জ্যোতি । সোমবার, ২৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৫৮
কমিটি করেও রক্ষা হচ্ছে না হালদা নদীর প্রাণ, প্রকৃতি ও ঐতিহ্য। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। নদীটি রক্ষায় বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকীতে ঘোষণা করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’। গঠন করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ বাস্তবায়ন’ কমিটি। কমিটি নিয়মিত বৈঠক করে প্রয়োজনীয় করণীয়ও নির্ধারণ করে। কিন্তু সমস্যা-সংকটের সমাধান হয়নি। প্রতিদিনই নানা কারণে নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং স্বকীয়তা নষ্ট হচ্ছে।
হালদা নদী বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। দেশের আভ্যন্তরীণ মৎস্য চাহিদা পুরণে শত শত বছর ধরে হালদার এই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করে আসছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রের নাম হালদা। হালদা নদী প্রবাহের প্রাকৃতিক পরিবেশগত নিরাপত্তা বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ ও কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে গণ্য। লক্ষ লক্ষ টন মৎস্য সম্পদ এবং হাজার হাজার মৎস্যচাষীর ভাগ্য এই হালাদার প্রাকৃতিক পরিবেশের অক্ষুন্নতার উপর নির্ভর করছে। অতএব হালদার যে কোনো বিপদের আশঙ্কা দেশের মৎস্য সম্পদ তথা জাতীয় অর্থনীতির জন্যই বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হবে। এ কারণেই হালদা নদী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসে। গত এক দশকের বেশী সময় ধরে অস্বাভাবিক দূষণ ও দখলে হালদার প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রের অস্তিত্ব ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
জানা যায়, হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার মওসুম সমাগত হলেও এ সময়ে নদীর এখানে সেখানে প্রায়শ ডিমওয়ালা মাছ মরে ভেসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব মৃত মাছের কোনো কোনোটা নদীতে চলমান ট্রলারের পাখায় বা বডিতে ধাক্কা লেখে অধবা নদীতে ফেলা শিল্প বর্জ্যরে দূষণে মৃত্যু হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে একই সময়ে বেশ কিছু মরা মা মাছ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। পানি দূষণ এবং ইঞ্জিন চালিত নৌকার পাখার আঘাতের পাশাপাশি মাছের ডিম ছাড়ার সময়ে গরমের দাবদাহ, প্রত্যাশিত বৃষ্টি না হওয়ার কারণেও হিটস্ট্রোকে মা মাছের মৃত্যুর আশঙ্কা করেছেন মৎস্য বিভাগের কোনো কোনো কর্মকর্তা। এহেন বাস্তবতায় গত সোমবার হাটহাজারি ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস অয়েলবাহী ট্যাঙ্কার মরাছরা রেলসেতুর উপর লাইনচ্যুত হয়ে হাজার হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল মরাছরা খালে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি ট্যাঙ্কারে ২৪ হাজার তেলসহ তিনটি ট্যাঙ্কার খালে পড়ে গেছে এবং আরো চারটি ট্যাঙ্কার লাইনচ্যুত হয়ে কাত হয়ে পড়লে সে সব তেলও খালে গিয়ে পড়ছে।
হালদার পানিতে অক্সিজেনের পরিমান স্বাভাবিক প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম এবং অ্যমোনিয়ার পরিমান অস্বাভাবিক হারে বেশী। হালদার আশপাশের খালগুলোতে এ হার আরো অনেক বেশী। হালদা নদীর তীরে এবং আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা কলকারখানা রাসায়নিক বর্জ্য শেষ পর্যন্ত হালাদায় গিয়ে পড়ছে যা ডিমওয়ালা মা মাছের জীবনচক্র বিপর্যস্ত করে তুলেছে। হালদা নদীর দূষণে মাছ মরে ভেসে উঠার ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় জেলে ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মৎস্য খাতের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন। ইতিমধ্যে কয়েকটি কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও হালদার প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ ও পানির গুনাগুণ রক্ষায় যা যা করণীয় তার সবই করতে হবে।
ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং কমিটি অকুস্থল পরিদর্শন করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হাজার হাজার লিটার ভাসমান তেল তুলে নেয়া এবং তেলমিশ্রিত পানি যেন হালদায় মিশতে না পারে তার জন্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ জাতীয়ভাবে জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে। হালদায় ডিম সংগ্রহের সময়কাল সম্পর্কে সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের আরো সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জানা যায়, হালদা নদীর উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে আছে- অসাধু চক্রের মা মাছ ধরতে জাল বসানো, ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করা, তীরে বাঁধ দিতে ব্লক বসানো, চর জাগা, নদী থেকে বালি ও মাটি উত্তোলন, অপরিকল্পিত রাবার ড্যাম, রাউজান-হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি পৌরসভার বর্জ্য নদীতে পড়া, হাটহাজারীর নন্দীর হাটে স্থানীয় মরা ছড়া খালের বর্জ্য নদীতে পড়া, নদীর তীরবর্তী এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা অবৈধ পোলট্রি ফার্মের বর্জ্য নদীতে পড়া, নদীর তীরবর্তী এলাকায় তামাক চাষ করা, সিডিএর অনন্যা আবাসিক এলাকার বর্জ্য নদীতে পড়া, মা মাছের আবাসস্থল বা কুমগুলো চিহ্নিত না থাকা। তাছাড়া মা মাছের আবাসস্থল বা কুম চিহ্নিত করে পাহারায় সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় না থাকা, হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হিসেবে ব্যবস্থাপনায় পৃথক জনবল কাঠামো না থাকা, ডিম থেকে পোনা ফোটানোর জন্য প্রয়োজনীয় হ্যাচারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা না থাকা।
লেখকঃ কলামিস্ট।

