চার্লি চ্যাপলিন:. হাসির ও আনন্দের বিশ্বজয়ী কালপুরুষ

চার্লি চ্যাপলিন:. হাসির ও আনন্দের বিশ্বজয়ী কালপুরুষ

মো. সাইফুল ইসলাম । বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:০০

বিশ্ব চলচ্চিত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছেন বহুবিধ কারণে। তিনি শুধু একজন শ্রেষ্ঠ কৌতুকাভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতাবাদী চিন্তাধারার অধিকারী। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রথম সারির একজন প্রবক্তাও ছিলেন তিনি। দরিদ্রদের প্রতি ছিলো অপরিসীম ভালোবাসা। জীবিতকালে যেমন অশেষ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন, মৃত্যুর পারেও জগতের সেরা কৌতুকাভিনেতা হিসাবে অমর হয়ে আছেন। বিশ্ব বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

সংক্ষেপে পরিচিতি
চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন একজন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক ও সুরকার। যিনি তার নিষ্পাপ ছেলেমানুষী কৌতুক অভিনয়, নানারকম তামাসা ও শারীরিক কসরত দ্বারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের মনোরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের শুরুর সময় থেকে মধ্যকাল পর্যন্ত চার্লি চ্যাপলিন তার অভিনয় ও পরিচালনা দিয়ে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেন। চ্যাপলিনকে বড় পর্দার শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতাদের একজন বলেও বিবেচনা করা হয়। চলচ্চিত্র শিল্প জগতে চ্যাপলিনের প্রভাব অনস্বীকার্য। শৈশব থেকে ১৯৭৭ সালে তার মৃত্যুর এক বছর পূর্ব পর্যন্ত তার কর্মজীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ৭৫ বছর।

৮ বছর বয়সে পেশাদার গায়ক
চার্লি চ্যাপলিন ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিল লন্ডনের এক বস্তির এক জীর্ন কুটিরে জন্মগ্রহণ করেন। চার্লি চ্যাপলিনের বাবা মা দু’জনেই ছিলেন থিয়েটার মঞ্চের গায়-গায়িকা। গান গেয়ে তারা যে সামান্য আয় করতেন তাই দিয়ে কোনো রকমে তাদের সংসার চলতো। অর্থের অভাবে মাত্র সাত বছর বয়সে চার্লি চ্যাপলিন বিভিন্ন বিচিত্রানুষ্ঠানে গান গেয়ে অর্থ রোজগার করতে শুরু করেন। এর এক বছর পর থেকে অর্থাৎ মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে চার্লি চ্যাপলিন পেশাদার গায়ক হিসাবে মঞ্চে আবির্ভূত হন।

সংসারে ভাঙন ও মায়ের পাগল হওয়া
কষ্ট ও দারিদ্রতায় পরিপূর্ণ ছিলো চার্লি চ্যাপলিনের শৈশব জীবন মাত্র ছয় বছর বয়সে চার্লির বাবা ও মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তখন চার্লি ও তার ভাইকে নিয়ে চার্লির মাকে অনাথ আশ্রমে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো। দরিদ্রতার দুঃচিন্তায় চার্লির মা কিছুদিনের মধ্যেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে পাগলা গারদে চলে যায়।
তখন আদালতের নির্দেশে চার্লি ও তার ভাইকে তার বাবার কাছে থাকতে হতো। চার্লির বাবা তখন আবারো বিবাহ করেছিলেন। সৎমায়ের সংসারে তাই চার্লি ভাইদের কষ্টের কোন কমতি ছিলনা। এক বছর পরে চার্লির মা ভালো হয়ে ফিরে আসলে তাদের জীবনে আবার প্রাণ ফিরে আসে।

অর্থ উপার্জনে হলিউড যাত্রা
১৯১০ সালে চার্লি চ্যাপলিনের বয়স যখন একুশ বছর, অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তখন তিনি আমেরিকায় গমন করেন। তিনি হলিউডে অভিনয়ের সুযোগ করে নেন। ১৯১৪ সালের মধ্যেই চার্লি চ্যাপলিন হলিউডে অভিনেতা হিসাবে সুনাম অর্জন করেন। এক সময় তিনি এক বছরেই পঁয়ত্রিশটা ছবিতে অভিনয় করে রেকর্ড সৃষ্টি করেন।

শরীরী অঙ্গ-ভঙ্গিতে দর্শক হৃদয় জয়
চার্লি চ্যাপলিন যখন অভিনয়ে আসেন, তখন ছবিতে শব্দের তথা সংলাপের ব্যবহার শুরু হয়নি। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে তিনি তার মাথার টুপি, হিটলারী কায়দায় গোঁফ এবং ছড়ি হাতে দ্রুত দুই পায়ের নানা ভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির অপরূপ কৌশল দেখিয়ে দর্শকদের মাঝে হাসির বন্যা বইয়ে দিতেন। তখন নির্বাক যুগের ক্লাসিক ছায়াছবির মধ্যে দি কিড, দি গোল্ডরাশ, দি চ্যাম্পিয়ন এবং শোল্ডার আর্মস্ প্রভৃতি ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন।

অভিনেতা থেকে পরিচালক
১৯১৪ সালেই চার্লি প্রথম পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার প্রথম পরিচালিত ও পরিচালনার সাথে অভিনীত প্রথম সিনেমা হলো ‘ক্যাচ ইন দ্যা রেইন’। যা তাকে খুবই জনপ্রিয়তা প্রদান করে এবং তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

তার অন্যতম ছবিগুলি
১৯২০ সালের শেষ দিকে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। ঐ সময় চার্লি চ্যাপলিন একে একে সিটি লাইট্স (১৯৩১), মর্ডান টাইম্স (১৯৩৬), দি গ্রেট ডিকটেটর (১৯৪০) এবং লাইমলাইট (১৯৫০) প্রভৃতি উপভোগ্য ও চমৎকার সব ছায়াছবি নির্মাণ করে বিরাট কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তার নিজের নির্মিত সব সবাক ছবির কাহিনী ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন চার্লি চ্যাপলিন নিজেই। কাহিনীকার হিসাবেও চার্লি চ্যাপলিন কৃতিত্বের পরিচয় দেন। দর্শকরা তার চমৎকার ও অভিনব চিন্তাধারা এবং অতুলনীয় হাস্যরসের উদ্রেককারী অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। প্রচুর আনন্দও পেতেন। মানুষকে হাসাতে পারাটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। চার্লি চ্যাপলিন প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ও সাম্যবাদে বিশ্বাসী ছিলে। ১৯৫১ সালে চার্লি চ্যাপলিন আমেরিকা থেকে ইউরোপে আসেন। দু’বছর পর আবার আমেরিকায় ফিরতে চাইলে, কমিউনিজমে বিশ্বাসকারী এই অজুহাতে তাকে আর আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি সুইজারল্যান্ড যান এবং সে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।

নাইট উপাধি
চলচ্চিত্র জগতে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ ১৯৭৫ সালে চার্লি চ্যাপলিনকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

চার্লি চ্যাপলিনের মৃত্যু
১৯৭৭ সালের অক্টোবর থেকেই চ্যাপলিনের শারীরিক অবস্থার প্রচন্ড অবনতি হয়। তাকে বাড়িতেই নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে রাখা হয়। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে ভোরে ঘুমের মধ্যে হার্ট স্ট্রোক এ আক্রান্ত হয়ে ৮৮ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

হাইলাইট
চার্লি চ্যাপলিন তার অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে এতটাই গড়ে তুলেছিলেন যে, তাকে চলচ্চিত্র জগতের প্রথম কিংবদন্তি অভিনেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার অভিনয় দেখা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ক্ষনিকের জন্য নিজেদের দুঃখ কষ্টের কথা ভুলে, না হেসে থাকতে পারেনি।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading