বজ্রপাত একটি নিরব ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ

বজ্রপাত একটি নিরব ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ

সাদেকুর রহমান । শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৫:০৫

বজ্রপাত একটি পুরনো প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রবণতা ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে গেছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে মারা গেছেন ২ হাজার ৫৯০ জন। অবশ্য বেসরকারি পরিবেশবাদী সংগঠন ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’ এক জরিপে জানায়, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গত ১১ বছরে দেশে বজ্রপাতে ২ হাজার ৮০০ জনের প্রাণহানি হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই খোলা মাঠ বা হাওরে কৃষিকাজ করছিলেন। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, বছরে গড়ে দেড় শতাধিক মানুষ বজ্রপাতের কবলে প্রাণ হারাচ্ছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ায় ২০১৬ সালে সরকার এটিকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে। এরপর বজ্রপাত ঠেকাতে নানা ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়কে আমাদের দেশে বজ্রপাতের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। একেকটা স্ট্রাইককে বলা হয় বজ্রপাত। পুরো ঘটনাকে বলা হয় বজ্রঝড়। বজ্রঝড় হলে একটার পর একটা ব্রজপাত হতেই থাকে। সাধারণত এটি ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। গত বছর অক্টোবর মাসেও বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বজ্রপাত আবহমানকাল ধরেই হচ্ছে, এখনও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। এটা বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই আমাদের চেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশ হয়ে ওঠেছে বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাত হটস্পট।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করার পরই এ নিয়ে কাজ করা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধিভুক্ত হয়েছে। এর বাইরে জনসচেতনতা তৈরির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে। বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির পরিবার দরিদ্র ও অসচ্ছল হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নিহতের পরিবারকে দাফন কাফন বাবদ নগদ বিশ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্যো প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে ‘তালগাছ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। এরপর আবহাওয়া অধিদপ্তর বজ্রপাতের আগাম সংকেত দেবার জন্য ‘লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর’ বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেকেলে পদ্ধতি হলেও বজ্রপাত নিরোধে তালগাছ অনেকটাই কার্যকর।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে টিআর আর কাবিখা প্রকল্পের আওতায় তালগাছ রোপণ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। সারাদেশে রাস্তার ধারে ও জমির আইলে অন্তত ৫৫ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের মাধ্যমে বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপন এবং মোবাইল অ্যাপ, মোবাইল ভয়েস ও মোবাইল টেক্সট মেসেজের সাহায্যে বজ্রপাত আঘাত হানার আগে কৃষকসহ অন্যান্যদের সতর্ক করা হবে। এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিও রয়েছে প্রকল্পের মধ্যে। এদিকে ঠিক একই রকম একটি প্রকল্প নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে বহু কৃষকের প্রাণহানি হয়। এ থেকে কৃষকসহ অন্যান্য মানুষকে রক্ষায় এ প্রকল্প কৃষি মন্ত্রণালয়ের।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় দেশের হাওরাঞ্চলসহ বজ্রপাতপ্রবণ ২৩ জেলায় ‘লাইটার অ্যারেস্টার’ সংবলিত বজ্রপাত-নিরোধক কংক্রিটের ছাউনি বা আশ্রয়কেন্দ্র (শেল্টার) নির্মাণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে হাওর এলাকায় ১ কিলোমিটার পরপর ১ হাজার বজ্রপাত-নিরোধক কংক্রিটের ছাউনি নির্মাণ করা হবে। মেঘ ডাকার গুরুম গুরুম আওয়াজ পেলেই মাঠের কৃষকসহ মানুষজন এসব ছাউনিতে আশ্রয় নিতে পারবে। প্রতিটি ছাউনিতে ‘লাইটার অ্যারেস্টার’ বসানো হবে। আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, অর্থাৎ বজ্রপাতের ৪০ মিনিট আগেই সংকেত দেবে সেই যন্ত্র। মোবাইলের মাধ্যমে এ সতর্কবার্তা মাঠের কৃষকসহ সবার কাছে পৌঁছে যাবে। প্রতিটি ছাউনির সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় জনসচেতনতা বাড়ানো হবে বলেও জানান ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণার পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নজরদারি বেড়েছে। বজ্রপাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে অবকাঠামোগত প্রস্তুতির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading