মশার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে প্রয়োজন সচেতনতা
ফারহাদ ইসলাম রনি । শনিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৮:১৫
একুশ শতকের পৃথিবীতে মানবজীবনের নতুন এক আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। এই আতঙ্কের মধ্যে পিছু ছাড়েনি পুরাতন আতঙ্ক। নোংরা পরিবেশে জন্ম নেওয়া এক ভয়াবহ জীবাণু বহনকারী ক্ষুদ্র পতঙ্গ মশা। যার দংশনে জীবন আজ জরাজীর্ণ। মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। গরম কাল আসার সাথে সাথেই ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে মশার বিস্তার। দিনে রাতে সব সময় মশার কামড়ে নাজেহাল নগরবাসী। দিনের বেলায়ও অফিস কিংবা বাসা বাড়িতে মশার কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে। আর একটু সন্ধ্যা হলেই মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে আরও কয়েক গুন।
ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথেই মশার উপদ্রব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। কয়েল, স্প্রে বা মশারি টাঙিয়েও মশার উৎপাত থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী। কেউই স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছে না। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সারাদিন মশার উপদ্রব থাকলেও সন্ধ্যার পরপরই এই উৎপাত আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত সুর হচ্ছে মশার এই গুঞ্জন। আমাদের মনস্তত্ত্বটাই এমন যে, রাতের অন্ধকারে মশা যদিও বা না কামড়ায় শুধু কানের কাছে এসে শব্দ করে তার পরও মনের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে। রাতের ঘুম একেবারে হারাম। মশার এ গুঞ্জন কিন্তু মশার ডানা ঝাপটানোর শব্দ। একটি মশা সেকেন্ডে ৩০০ থেকে ৬০০ বার ডানা ঝাপটাতে পারে আর অতি অল্প সময়ে এতবার ডানা ঝাপটানোর দরুণই আমরা গুনগুন শব্দ শুনতে পাই। মশা এক যন্ত্রণাদায়ক পতঙ্গের নাম। বিরক্তিকর উপদ্রবের পাশাপাশি তারা রোগজীবাণু সংক্রামণ করে। এই মশা অনেক সময় মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, পীত জ্বর, জিকা ভাইরাস প্রভৃতি মারাত্মক রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে। স্প্রে, কয়েল, অ্যারোসল কোনো কিছুতেই মশা তাড়ানো সহজ নয়। আবার এসব দিয়ে মশা তাড়ালেও আমাদের স্বাস্থ্য এতে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, জিকাসহ ভয়াবহ সব রোগ হয় মশার কামড়ে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে জানা যায়, এ মৌসুমে যেসব মশা দেখা যাচ্ছে তার ৯৯ শতাংশই নাকি কিউলেক্স মশা। এ মশায় আসলে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা কম। এক শতাংশ আছে এডিস মশা, এ মশায় কামড়ালেই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগ হয়। মশার উপদ্রবকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখা হয় বলেই এর কোনো সুরাহা হয় না। কোটি কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে মশা নিধনের নামে। অথচ এ মশার কামড়ে সংক্রমিত হয় চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর, জিকা ভাইরাসের মতো ভয়াবহ সব রোগ।
ডেঙ্গু থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং এডিস মশা প্রতিরোধ। এডিস মশার উপদ্রব কমাতে ঘরবাড়ি এবং বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। বাড়ির বারান্দা বা ছাদের টবে বা পাত্রে যেন কোনো ধরনের পানি পাঁচ দিনের বেশি জমে না থাকে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থান যেমন : প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, ডাবের পরিত্যক্ত খোসা, ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, কন্টেইনার, ব্যাটারির শেল, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, বাথরুমের কমোড, ঘরের অ্যাকুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে পানি জমিয়ে রাখবেন না। ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখুন সবসময়। ময়লা-আবর্জনা ফেলার পাত্র ঢেকে রাখুন। মশারী ব্যবহার করতে হবে। বাথরুম অযথা ভেজা রাখবেন না। ডোবা,নর্দমা, ড্রেইন, ঝোপঝাড়, জঙ্গল, কচুরিপানা পরিষ্কার করে মাঝে মাঝে ঔষধ ছিটাতে হবে যেন মশা ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটাতে না পারে। রাস্তাঘাট, জলাধার, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, অফিস-আদালতের আনাচে-কানাচে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন মশা নিধনের জন্য স্প্রে বা ফগিং করুন। এক কথায় পৌরসভা, সিটিকরপোরেশন, সংস্থা, সরকারসহ সকল জনগণকে মশা নিধনে সচেষ্ট হতে হবে। সকলের সক্রিয় ও সযত্ন প্রচেষ্টায় মশা থেকে বাঁচা সম্ভব। সম্ভব মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা ও মশা থেকে সৃষ্ট রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

