ঢাকা শহরের খেলাধুলার মাঠ হারিয়ে গেল কোথায়!

ঢাকা শহরের খেলাধুলার মাঠ হারিয়ে গেল কোথায়!

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫

ঢাকা শহর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। মাঠ দখল করে গড়ে উটছে নানা স্থাপনা, ক্লাব, এমনকি হাটবাজার পর্যন্ত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুষ্ঠু বিকাশে দখলকৃত মাঠ পুনরুদ্ধারই নয়, বানাতে হবে নতুন মাঠও। সিটি কর্পোরেশনকে নদী-খাল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মাঠ পুনরুদ্ধারের করতে হবে। এছাড়া মাঠ তদারকিতে প্রয়োজন আলাদা কর্তৃপক্ষ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মো. সাইফুল ইসলাম

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ আছে ২৩৫টি। সিটি কর্পোরেশনের মালিকানার বাইরে আরো কিছু মাঠ আছে। সিটি কর্পোরেশনের এই মাঠগুলোর মাত্র ৪২টি মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারে। বাকি মাঠগুলো নানাভাবে দখল হয়ে আছে৷ শতকরা হিসেবে মাত্র ১৮ ভাগ মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ৬০ ভাগ। আর সরকারের অধীনে আছে সাত ভাগ। তবে সিটি কর্পোরেশনের মালিকানার বাইরের মাঠগুলো ধরলে সর্বোচ্চ ৩০ ভাগ মাঠ এখনো দখলমুক্ত আছে। কিন্তু সেই মাঠগুলোর সবগুলোতে সাধারণ মানুষ যেতে পারেন না। সরকার কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে মাঠ পুনুরুদ্ধারে আরও বেগবান ও যত্নশীল হতে হবে।

নতুন মাঠ তৈরি
নগর পরিকল্পনায় লিখে রেখে মাঠ দখলের প্রবণতা রুখতে হবে এবং নতুন মাঠ তৈরি করতে হবে। নির্দিষ্ট হাউজিং, ব্লক বা এলাকায় নির্দিষ্ট মাঠ থাকবে। প্রয়োজনে একের অধিক মাঠ থাকতে পারে। গাদাগাদি করে বাসস্থান না তৈরি করে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রেখে মাঠ বানাতে হবে। সিটি কর্পোরেশনকে এব্যপারে কঠোর হতে হবে। মাঠ ছাড়া কোন হাউজিং প্রকল্প বা আবাসিক এলাকার বরাদ্দ রুখে দিতে হবে।

আলাদা কর্তৃপক্ষ
বিভিন্ন খাত রক্ষার জন্য দেশে আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ আছে। কিন্তু খেলার মাঠ রক্ষায়, সংরক্ষণ কিংবা রক্ষানাবেক্ষণে নেই কোন আলাদা কর্তৃপক্ষ। বর্তমান দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের উপর ন্যস্ত হলেও তারা বিশেষ নজর দিচ্ছেন না। ফলে সহজেই বেদখল হচ্ছে খেলার মাঠ। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে নগরবিদরা বলছেন, রাজধানীতে মাঠের সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে, অভিভাবকত্ব ও তদারকির অভাব। অন্যান্য দেশে যেমন মাঠ তদারকির জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে কিন্তু আমাদের দেশে মাঠ তদারকির জন্য একক কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাঠগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

আদিল মুহাম্মদ খান


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় বর্তমানে সরকারিভাবে যে মাঠ রয়েছে সেটি তিনটি সংস্থার। এর মধ্যে যেহেতু সিটি করপোরেশন জনপ্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত সেহেতু মাঠ তদারকির ক্ষেত্রে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকার খালের মতো খেলার মাঠ ও পার্কগুলোও সিটি করপোরেশনের অধীনে দিতে হবে। আর পাড়ামহল্লায় তা তদারকির জন্য কমিটি করে দিতে হবে। সঠিক তদারকির অভাবে সরকারি ও বেসরকারি মাঠগুলোতে বিভিন্ন স্হাপনা উঠে সেগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। অনেকে মাঠকেন্দ্রিক ক্লাব করেও মাঠ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে। এটি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি

আইন কার্যকরের দাবি
ক্রীড়াসংগঠক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববির মতে, প্রণীত আইন কার্যকর করে মাঠ রক্ষা উদ্যোগী হতে হবে। তিনি বলেছেন, আমাদের জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস হয়েছিল নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে৷ সেটি ছিল বোধহয় উন্মুক্ত জলাশয় ও খেলার মাঠ সংরক্ষণের ব্যাপারে৷ আইনটি যদি এখনো কার্যকর থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষ সেটি মাথায় রেখে কাজ করবেন বলে বিশ্বাস করি৷ খেলার মাঠ না থাকলে শিশুরা যাবে কোথায়?


এছাড়া নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নির্দিষ্ট মাঠ রাখার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই অনেক কিছু ভুল করে ফেলেছি। পাকিস্তান আমলেও দেখেছি, নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নির্দিষ্ট মাঠ রাখা৷ সেগুলোও শেষ পর্যন্ত থাকেনি৷ এরপর খোলা জায়গা পেলে নাগরিকরা বিকল্প ব্যবস্থা করে নিয়েছে৷ এসবের জন্যই সমস্যা৷ মাঠ নির্দিষ্ট করা থাকলে আমার মনে হয়, এ প্রশ্নগুলো আসতো না৷ জনসংখ্যার অনুপাতে যদি এলাকায় নির্দিষ্ট মাঠ না থাকে, তাহলে এ সমস্যাগুলো হতেই থাকবে৷

উন্নয়নের বলি মাঠ
সিটি করপোরেশন আধুনিকায়নের কবলে দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে মাঠ। বড় মগবাজার মধুবাগ মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে উন্নয়ন কাজের জন্য। মাঠটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের ভেতর চারপাশে ওয়াকওয়ের কাজ চলছে। পানি নিষ্কাষণের জন্য ড্রেনের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র। এছাড়া পুরো মাঠে নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে এলোমেলোভাবে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের কাজ হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মাঠ বৃদ্ধি করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে সিটি করপোরেশনের বাইরেও যেসব সংস্হার মাঠ রয়েছে সেগুলোও সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করলে সিটি করপোরেশন তার আধুনিকায়নে কাজ করবে ও তা যেন দখল না হয়ে যায় সেটি দেখবে।

মাঠখেকো চক্র বন্ধ করতে হবে
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র সভাপতি ড. মোহাম্মদ আবদুল মতিন বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উল্টো দিকের পার্কটি এখন বলতে গেলে বন্ধ৷ ওখানে উন্নয়ন করা হয়েছিল৷ লোকজনের বসার ও হাঁটার জায়গা করা হয়েছে৷ এখন নাকি সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং করা হবে৷ তার উপরে মাঠ হবে৷ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের নাকি গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা নেই, তাই এসবের উদ্যোগ৷ আমি বুঝি না কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়৷’
তার কথা, কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কারা মাঠ দখল করে৷ এটা একটা চক্র৷ এখানে ব্যক্তি আছে৷ প্রতিষ্ঠানও আছে৷ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাসহ নানা ধরনের ক্ষমতা আছে৷ তিনি বলেন, ঢাকা শহরের চারপাশ হাউজিং কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে৷ জলাধার, নদী এসব ভরাট করে তারা ভবন নির্মাণ করছে৷ সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে তাদের হাতে ধরে ধনী বানানো হচ্ছে৷


তার কথায়, দুই ধরনের লোক মাঠ দখল করছেন৷ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং আর্থিক ও পেশিশক্তির অধিকারী যারা, তারা৷ আর বড় দখল দেখে ছোট দখলদারেরা উৎসাহিত হয়৷ বিভিন্ন এলকায় মাঠ দখল করে মার্কেট, বাজার, কাঁচাবাজার স্থাপনের পিছনে স্থানীয় পেশিশক্তিধারী লোকেরা।

তরুণ প্রজন্মকে সোচ্চার হতে হবে
ইতিহাস বলছে, মাঠ রক্ষা করতে বহু আগে থেকেই তরুণ প্রজন্মকে সোচ্চার হতে হয়েছে। বর্তমান আবাহনী মাঠের সৃষ্টি হয় এমনি এক প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। ধানমন্ডির ২২ নম্বর সড়কের পার্শ্ববর্তী খেলার মাঠটি (বর্তমান আবাহনী মাঠ) তত্কালীন পাকিস্তান সরকার গোপনে মূল নকশা ও পরিকল্পনায় বাসস্থানের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামাল। তার নেতৃত্বে তরুণরা প্রতিবাদ শুরু করে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। পরে শেখ কামালের জোরালো ভূমিকার কারণে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কাছে শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। রক্ষা পেয়ে যাওয়া সেদিনের খেলার মাঠটি আজকের আবাহনী মাঠ হিসেবে পরিচিত।

শিশুরা কোথায় যাবে?
প্রধানমন্ত্রীর ‘অনুশাসন’ আছে যে, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে দুইটি করে মাঠ থাকতে হবে৷ কিন্তু কাগজে-কলমেও ঢাকার ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো মাঠ নেই৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শহরে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা দরকার৷ কিন্তু ঢাকা শহরে আছে এক বর্গ মিটারেরও কম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক, নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এই শহরের নাগরিকদের কথা না ভেবে খোলা জায়গাগুলো দখল করা হচ্ছে৷ এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা৷ তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না৷ মোবাশ্বের হোসেন মনে করেন, এর ফলে আমরা ভবিষ্যতে একটি হৃদয়হীন ও অসামজিক প্রজন্ম পাবো৷ যাদের দুনিয়া হবে টিভি ও মেবাইল ফোন৷ তারা বাস্তব দুনিয়া চিনবে না৷ আর আব্দুল মতিন বলেন, খোলা মাঠ আর সবুজ না থাকলে এক সময় জীবনও থাকবে না৷

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩০ এপ্রিল ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

বিপথে ও অপরাধে জড়াচ্ছে শিশু-কিশোররা
আগে যেখানে শিশু-কিশোররা আড্ডা দিত, তাদের সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো সে জায়গাগুলো কমে যাওয়ায় শিশুরা অনেকটা ঘরকুনো হয়ে উঠেছে। তাদের স্মার্টফোনে আসক্তি বেড়েছে, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে সমাজে ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের বেড়ে ওঠায়। সরকারের উচিত হবে, এ সব মাঠ উদ্ধার করে শিশু-কিশোরদের সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।

সুন্দরের নামে কংক্রিটের চাদরে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে চারিদিক৷ মাঠের উপর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে পেভার ব্লক৷ এসকল উন্নয়ন কর্মকান্ডের নামে আর মাঠ বেদখল হতে দেয়া চলবে না। সর্বোপরি সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও মাঠ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাতে আশা করি আমাদের তিলোত্তমা নগরীতে মুক্ত বাতাস পাওয়র জন্য ও শিশু-কিশোরদের জন্য প্রাণবন্ত খেলার জায়গা পাব।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading