কাঁচের দেয়াল শত কোটি পাখির মরণ ফাঁদ

কাঁচের দেয়াল শত কোটি পাখির মরণ ফাঁদ

আশিকুর রহমান । শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:২০

“মুক্তমনের পাখি আমি, স্বডানায় ভর করে, উড়ে চলি দূর অজানায়।” দূর অজানাতে উড়তে গিয়ে প্রতিবছর প্রাণ হারাচ্ছে প্রায় একশ কোটি পাখি। আধুনিক নির্মাণ সামগ্রীর অন্যতম উপাদান কাচ। ঘরে দিনের আলো প্রবেশের জন্য কাচ ছাড়া বহুতল ভবন কল্পনা করাই যায় না। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে কাচের দেওয়াল পাখিদের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ। কারণ মানুষ পরিষ্কার কাচকে যেভাবে দেখে পাখি ঠিক সেভাবে দেখে না। তাই কাচের দেওয়ালের সাথে সংঘর্ষে মারা পড়ছে অনেক পাখি।

২০১৯ সালের জরিপে উঠে এসেছে আমেরিকার প্রতিবছর বিভিন্ন ভবনের কাঁচের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারা যাওয়া পাখির সংখ্যা প্রায় একশ কোটি । প্রতিবছর শীত শুরুর আগে পাখিরা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দিকে যায়। পরে আবার ফিরে আসে। রাতে ওড়ার সময় পাখিরা আলোকিত কাঁচের ভবনকে তারার আলো মনে করে সেদিকে ছুটে যায়। শহরের আলোকিত ভবনগুলোর ঘনত্ব পাখিদের জন্য বিপজ্জনক। পাখিদের কৃত্রিম রাতের আলো আকর্ষণ করে এবং বিভ্রান্ত করে। তারা বিশ্বাস করে আলোর দিকে উড়ছে, পাখিরা ঘুরে বেড়ায় এবং বাধা পেয়ে বিভ্রান্ত হয়ে মারা যায়।

আমেরিকার পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের অ্যালেনটাউনে অবস্থিত মুলেনবার্গ কলেজের পাখিবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ক্লেম জুনিয়র পাখির এমন মৃত্যু নিয়ে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন। ড্যানিয়েল ক্লেম জুনিয়র বলেন পাখিদের আবাস ধ্বংসের পরই পাখিদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে কাঁচের ভবন। এছাড়া উঁচু ভবনের চেয়ে নিচু ও মাঝারি আকারের কাঁচের ভবন পাখিদের জন্য বেশি হুমকি বলে মনে করেন তিনি। গত সেপ্টেম্বরের এক সকালে নিউইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের আশপাশ থেকে এক ঘণ্টায় ২২৬টি মৃত পাখি খুঁজে পেয়েছিলেন মেলিসা ব্রেয়ার। মেলিসা ব্রেয়ার “এনওয়াইসি আডবন” নামে একটি সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক।এনওয়াইসি আডবন নামের সংস্থাটি এক গবেযনায় জানায় নিউইয়র্কে প্রতিবছর ভবনের কাঁচের সঙ্গে সংঘর্ষে ৯০ হাজার থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার পাখি মারা যায়।

এনওয়াইসি আডবন জীববিজ্ঞানী কেইটলিন পারকিনস বলেছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হল প্রতিফলিত কাচ।কাচের দেওয়ালে গাছপালা এবং আকাশের যে প্রতিচ্ছবি দেখা যায় তা পাখিরা বাস্তব মনে করে। মুক্ত আকাশে পাড়ি দিতে কাচের দেওয়াল ভেদ করে সেখানে যেতে চায়। তারা দ্রুত স্থানান্তরে হতে যায় এবং মারা পড়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিজ্ঞানী ‘পাখি মারা’ যাওয়ার কারণ হিসেবে কাচের জানালাকে গ্রহণ করেছেন। বিনবিন লি চীনে উইন্ডো স্ট্রাইক পর্যবেক্ষণকারী দুটি গ্রুপের একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ডিউক কুনশান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডিউকে পিএইচডি লাভ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখি প্রকল্পের শীর্ষস্থানীয় গবেষকের সাথে দেখা করেন।

বিনবিন লি বলেন, প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটি শুধুমাত্র ডিউক বা রাজ্যের সমস্যা।কিন্তু আমি চীনে এই পরিসংখ্যান দেখে অবাক হই। এক মাসের মধ্যে সুজো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তিনটি মৃত পাখির সন্ধান পাই। এবং পাখিগুলো কাঁচের করিডোরের নিচে পাওয়া যায়। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী আন্ড্রেস ওডিন বলেন,পাখিরা অতিবেগুনি রশ্মি দেখতে পায়। কিন্তু মানুষ সেটা দেখে না।

গত জানুয়ারিতে নিউইয়র্ক শহর কর্তৃপক্ষ পরিযায়ী পাখি চলাচলের মৌসুমে সরকারি ভবনগুলোতে রাতের বেলায় লাইট বন্ধ রাখার আইন করেছে৷ তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডায় কয়েকটি সংগঠন পাখির মৃত্যু কমাতে আইন প্রনয়ণে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করছে৷ পাখির মৃত্যু ঠেকাতে এনওয়াইসি আডবন ভবন মালিকদের কাচের উপর এক বিশেষ ধরনের ফয়েল জড়ানোর অনুরোধ করছে৷ এতে প্রতিফলন কিছুটা কমবে বলে মনে করছে তারা৷ এছাড়া এই ধরনের ফয়েল ঘর গরম ও ঠান্ডা রাখার খরচও কমাবে৷

গতবছর থেকে নতুন ভবনের নকশা করার সময় স্থপতিদের পাখিবান্ধব নকশা ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কাচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি এমন ধরনের কাচ তৈরির চেষ্টা করছে, যেগুলো মানুষের কাছে অভিন্ন মনে হলেও পাখিরা ঠিকই পার্থক্যটা ধরতে পারবে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading