মাও সে তুং: পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০১ মে ২০২২ । আপডেট ০২:১০
রুশ অক্টোবর বিপ্লবের পরে পৃথিবীর যে দেশে সাম্যবাদী সরকার স্থাপিত হয়েছে, সেটি হল চীন। দীর্ঘদিন ধরে চীনকে বিভিন্ন বিদেশি শক্তি নানাভাবে শাসন করেছে। চীনের সাংস্কৃতির বুকে ঘটিয়েছে একটির পর একটি ধ্বংসাত্মক আক্রমণ ৷ যে মানুষটি মনের দৃঢ়তাকে সম্বল করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন, তিনি হলেন মাও সে তুং। সাম্যবাদী মহান নেতা মাও সে তুং এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
কিংবদন্তি এক মহান চরিত্র মাও সে তুং। তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যত কথা বলা হোক না কেন, বিপ্লবের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপোসহীন সত্তা। জীবনে যা সত্য এবং শাশ্বত বলে মনে করেছেন, তার জন্য জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করতে রাজি ছিলেন।
মাও সে তুং
মাও সে তুং ছিলেন একজন চীনা বিপ্লবী মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক নেতা। ১৯৪৯ সালে সমাজতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাও সে তুং চীন শাসন করেন। মাও সে তুং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদে তার তাত্ত্বিক অবদান, সমর কৌশল এবং তার কমিউনিজমের নীতি এখন একত্রে মাওবাদ নামে পরিচিত।
নেতা হিসেবে মাও সে তুং এর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব হল, তিনি লেনিন এবং মার্কসবাদের অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। তিনি চীনদেশের সাম্যবাদকে নতুন মোড়কে বন্দি করে ছিলেন। যাতে এই সাম্যবাদ চীনদেশের সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। চীনে শ্রমিক এবং কৃষকদের সাথে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক শাসন স্থাপন করেছিলেন মাও সে তুং। সারা পৃথিবী তাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদের একজন হিসেবে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে থাকে।
জন্ম ও শৈশবকাল
চীন বিপ্লবের মহানায়ক মাও সে তুং এর জন্ম হয়েছিল ১৮৯৩ সালের ২৬শে ডিসেম্বর হুনানের এক কৃষক পরিবারে। ছোটো থেকেই কৃষিকাজে তাকে যোগ দিতে হয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হত। পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও স্কুলে যাবার সময় পেতেন না। বাবাকে একথা বলেও কোনো লাভ হত না। বাবা ছিলেন বাস্তববাদী মানুষ। তিনি বারবার বলতেন স্কুলে গিয়ে কী হবে, সেই সময়টা কৃষিকাজে মন দাও!
তার শিক্ষাজীবন
এক ধনী ব্যক্তির সহায়তায় স্কুলে ভর্তি হলেন তিনি। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর চোখের সামনে এক বন্ধ দুয়ার খুলে গেল। এত মনীষীর ছড়াছড়ি, এত বুদ্ধির বিচ্ছুরণ দেখে মাও সে তুং অবাক হয়ে গেলেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিভিন্ন বই পড়ার চেষ্টা করতেন। তাকে আকর্ষণ করত প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস এবং সমাজ বিজ্ঞানের বই। চীনের ইতিহাস পাঠ করে মাও জানতে পারলেন, ১৮৫০-১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চীনদেশে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল, সেটি হল তাইপে বিপ্লব। এই সূত্রে জানতে পারলেন জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রী মহান নেতা সান ইয়াৎ সেনের নাম। চীনে তার নেতৃত্বে কৃষক বিপ্লব হয়। এইভাবে মাঞ্চু রাজবংশের প্রজা নিপীড়নের পালা শেষ হয়ে যায়।
কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র আন্দোলন
কমিউনিস্ট পার্টি যখন ক্ষমতা দখল করেছিল, তখন মাও সে তুং তাইপে বিদ্রোহ এবং সান ইয়াৎ সেনের আন্দোলনের কথা মনে রেখেছিলেন। সেই অবস্থাতেই মাও সে তুং সাধারণ মানুষদের সাথে মিশতে শুরু করেন। পিকিং-এ এসে পরিচিত হন চিও সু চিউ–এর সঙ্গে। এই ভদ্রলোক ছিলেন একজন পণ্ডিত এবং রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী। তার উদ্যোগেই চীনের বুকে কমিউনিস্ট পার্টি স্থাপিত হয়েছিল। ১৯১৪ সালে চিন সফরে বেরিয়ে মাও এলেন সাংহাইতে। ছাত্র আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করলেন।
কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান
এই জাতীয়তাবাদী গণ আন্দোলন সেদিনের সদ্য তরুণ মাওকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯২০ সালে তিনি কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পাঠ করে নিজেকে কমিউনিস্ট বলে ঘোষণা করেন। ১৯২১ সালে গেলেন সাংহাইতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা উৎসবে যোগ দিতে। তিরিশের দশকে মাও এক অসাধারণ শক্তিশালী সাম্যবাদী দল গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে সারা পৃথিবীতে প্রথম শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। লেনিনকে আদর্শ করে এগিয়ে গেলেন শ্রেণি সংগ্রামে। শেষ অব্দি তার স্বপ্ন সফল হল। ১৯৩৬ সালে মাও এর নেতৃত্বে ছয় হাজার সমর্থক ১২ হাজার বর্গমাইল পায়ে হাঁটলেন। তারা অতিক্রম করলেন দক্ষিনের হুনান, ফুকেন, ইয়াংসি থেকে উত্তর পশ্চিমের শেনানি প্রদেশে পিছিয়ে যান। পশ্চাদপদসরনের এই ঘটনা মানুষের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। এই দীর্ঘ পদযাত্রাকেই বলা হয় লং মার্চ। এইভাবে বিশ্বের ইতিহাসে এক নবচেতনার উদ্ভব ঘটে গেল।
মহান এই নেতা চীনকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তবে মাও থাকার সময়েই চীনে নানা ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা যায়। পার্টির মধ্যে দেখা দেয় তীব্র মতবিরোধ। সংস্কারকামী উদারপন্থী নেতৃবর্গ জনসমর্থন লাভ করেন। সংস্কারপন্থী নেতৃবর্গের এই আদর্শ ও পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে গিয়ে মাদাম মাও সে তুং থেকে শুরু করে মাওপন্থী কট্টর নেতৃবর্গ কারারুদ্ধ হন। চীনের সাধারণ মানুষ ও কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এই নেতৃবর্গ গ্যাং অব ফোর নামে ধিকৃত হন।
মাও সে তুং এর মৃত্যু
চীনের এই অবিসংবাদিত মহান নেতা ১৯৭৬ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর ৮৩ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার মরদেহ চীনে মমি করে একটি কাচের শবাধারে রক্ষিত আছে।
ইউডি/অনিক

