রাজনীতি অর্থনীতি প্রশাসন শিল্প-সাহিত্যে বণার্ঢ্য ও বহুমুখী এক ব্যক্তিত্ব: আবুল মাল আবদুল মুহিত
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০১ মে ২০২২ । আপডেট ০২:২৫
বর্ণাঢ্য এক জীবনের ইতি টানলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। দ্যুতিময় জীবনে পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এই গুনীজন। দেশ সেরা অর্থমন্ত্রীর প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মো. সাইফুল অনিক।
আবুল মাল আবদুল মুহিত–একাধারে একজন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক ও ভাষাসৈনিক। মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে আমলা ও রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা মুহিতের দখলে রয়েছে মোট ১২টি বাজেট উত্থাপনের রেকর্ড। এর মধ্যে টানা ১০টি বাজেট উত্থাপন করেছেন। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী মুহিত ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। ভাষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে, মুহিতের অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টির সাথে, বাংলাদেশ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বর্ধিত বাজেটের আকার, জনসাধারণের ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষার জালে বর্ধিত ব্যয়, মেগা প্রকল্পের কাজগুলো চালু করাসহ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে উচ্চ ব্যয়ের সাথে সুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করেছে এবং দারিদ্র্যের হারও হ্রাস পেয়েছে।
যুদ্ধে পাকিস্তান ত্যাগী প্রথম কূটনীতিক
ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। তখন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকোনমিক কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালেন করেন তিনি। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে মুহিত সবিশেষ পারদর্শী। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও, ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মুহিত।
তার হাত ধরে বড় বাজেটে বাংলাদেশ
তার আমলে অর্থনীতিকে, বাজেটকে বড় করে দেখবার চোখ হয়েছে বাংলাদেশের। ২০০৯ সালের ১১ জুন (৩৯তম) সংসদে উত্থাপন করেন, তার আকার ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। এই বাজেটটির মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো দেশের বাজেটের আকার ছাড়িয়ে যায় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তার সময়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ‘প্রবৃদ্ধি’ এবং তিনি মনে করতেন যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা শহর-গ্রাম নির্বিশেষে হয়েছে। ধনী-গরিব নির্বিশেষেও হয়েছে। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ এত বড়, দেশের অর্থনীতি এখানে সমন্বিত হতে পেরেছে। এটাই তার বড় কৃতিত্ব।
টানা দশ বছর সেই দায়িত্ব পালন করা মুহিত ২০১৮ সালে অবসরে যান। ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভার উত্তরসূরি আ হ ম মুস্তফা কামালের হাতে তুলে দেওয়ার দিনে মুহিত বলেছিলেন, ‘আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির দেশ হিসেবে জি টোয়েন্টিতে দাওয়াত পেয়ে অংশগ্রহণ করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।’
তার সময়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার সাথে বেড়েছে প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশে গত ৩০ বছর যাবত অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি এবং বাজেট পর্যালোচনা নিয়ে কাজ করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। মি. ভট্টাচার্য বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে মুহিত যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, সে সময়টিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মোটামুটি ভালো ছিল। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে সাথে প্রবৃদ্ধির মাত্রাও মোটামুটি ভালো ছিল এবং তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। তিনি অর্থমন্ত্রী থাকার সময় কৃষি ও শিল্পে বড় ধরনের কোন সংকট লক্ষ্য করা যায়নি।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা টেকসই করার জন্য যেসব কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল সেটি দেখা যায়নি মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকার সময়। সুষম উন্নয়নের জন্য ওনার আকাঙ্ক্ষার অভাব ছিল এটা আমি বলছি না। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো এবং পেশাজীবীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার ছিল – সেটা ওনার ক্ষেত্রে অনেক সময় হয়নি।

পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর সহায়ক
টেকসই ভিত্তিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে দেশকে সাহায্য করেছেন তিনি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্মকান্ডের সাফল্যের জন্য সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংক মিথ্যা অভিযোগে তাদের প্রস্তাবিত ১শ’ ২০ কোটি আমেরিকান ডলার প্রত্যাহার করে নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন আবুল মাল আবদুল মুহিত অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে বিশেষ অবদান রাখেন। যা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। পাশাপাশি পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থনৈতিক যোগানে অনেক সহায়ক হয়।
রাজনীতির পাশাপাশি সমাজ কর্ম
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আর সব আমলা বা রাজনীতিকের মতো ছিলেন না। তিনি সামাজিক নানা সংগঠন ও আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন, লেখালেখি করতেন, সংস্কৃতি অন্তপ্রাণ মানুষ ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সরকার তাকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তা দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ে মুহিত বই লিখেছেন ৪০টি।
রাজনীতি থেকে অবসর
দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করে আর নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের ঘোষণায়ও তিনি ব্যতিক্রম। অবসর নিয়েও মুজিববর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের জাতীয় অনুষ্ঠানে গত বছরের ১৬ই ডিসেম্বর তিনি অংশ গ্রহণ করেছেন। একজন ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আর্ন্তজাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে বাংলাদেশের সম্পৃক্তি ও সমৃদ্ধিতে তিনি এক রূপান্তরের নায়ক। ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন এই আলোকিত গুণীজন একজন ন্যায়নিষ্ঠ,সজ্জন চিৎপ্রকর্ষবিদ।

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক
সাবেক অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এক শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত রচনায় আবুল মাল আবদুল মুহিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্র প্রধান বলেন একটি উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের অগ্রযাত্রায় মুহিতের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। রাষ্ট্রপতি হামিদ মরহুম মুহিতের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবেক অর্থমন্ত্রী, প্রাক্তন সংসদ সদস্য এবং ভাষা সৈনিক আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোক বার্তায় তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্ত সফল অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ তার কর্মের মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান দূতাবাসে চাকরিরত অবস্থায় পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ প্রথম বাংলাদেশ সরকারে যোগদান করেন।’
শেখ হাসিনা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়া স্পিকার, সরকারের মন্ত্রীবৃন্দ, বিরোধী দলীয় নেতাসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মীরা তার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করেছেন।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ভালবাসায় সিক্ত
সর্বস্তরের মানুষের ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সিক্ত হলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। সাধারণ মানুষ গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিশিষ্টজন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় সাবেক এ অর্থমন্ত্রীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। এ সময় তার ছোট ভাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শায়িত হবেন মা-বাবার কবরের পাশে
আজ রবিবার সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে মা সৈয়দা শাহারা বানু চৌধুরী ও বাবা আবদুল হাফিজের কবরের পাশে শায়িত হবেন সাবেক এই অর্থমন্ত্রী। এর আগে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর ১২টায় সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আবুল মাল আবদুল মুহিতের মরদেহ নেওয়া হবে। দুপুর ২টায় সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। তিনি ছিলেন সততা ও নিষ্ঠার মূর্ত প্রতীক। যিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এক দশকের ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা দিয়ে আজ ৮৮ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হলো। বাংলাদেশের উন্নয়নে আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভূমিকার কথা জাতি চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
ইউডি/অনিক

