আগামী বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জ সুপেয় পানি
শামসুর রহমান । রবিবার, ৮ মে ২০২২ । আপডেট ১০:৫০
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত এক প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিবছর ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ সভা ২২ মার্চ তারিখটিকে বিশ্ব জল দিবস বা বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনের (ইউএনসিইডি) এজেন্ডা ২১-এ প্রথম বিশ্ব জল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রথম বিশ্ব জল দিবস পালিত হয় এবং তারপর থেকে এই দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলি এই দিনটিকে নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমার মধ্যে জাতিসংঘের জলসম্পদ সংক্রান্ত সুপারিশ ও উন্নয়ন প্রস্তাবগুলির প্রতি মনোনিবেশের দিন হিসেবে উৎসর্গ করে। পরিবেশের প্রধান চারটি উপাদানের মধ্য অন্যতম একটি উপাদান হচ্ছে পানি। পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৭০ ভাগ জুড়েই রয়েছে পানি। কিন্তু সব পানি ব্যবহার উপযোগী নয়। পৃথিবীর মোট জলভাগের প্রায় ৯৭ দশমিক তিন ভাগ হচ্ছে লোনাপানি আর বাকি দুই দশমিক সাত ভাগ হচ্ছে স্বাদু পানি।
পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া প্রাণীকূলের অস্তিত্বও চিন্তা করা যায় না। সুপেয় পানির প্রাপ্তির সুযোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘ পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে পানি সুস্থ জীবনের জন্য একটি আবশ্যক উপাদান। কিন্তু সুস্থ জীবনযাপনে একজন মানুষের প্রতিদিন কতটুকু পানি পান করা জরুরি? বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের শরীরের ৭০ ভাগের বেশিই হচ্ছে পানি, এজন্য সারা বছরই পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। দেশে চাষাবাদের জন্য যোগ্য পানির অভাব দিন দিন বেড়েই চলছে। উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে লবণাক্ততা আর উত্তরের জেলাগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদের পানি সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানির অভাবে সেসব অঞ্চলে চাষাবাদের ধরণও পরিবর্তন হয়েছে। যেমন উত্তর ও উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের জেলাগুলোতে আগে যারা ধান চাষ করত তারা এখন ফল ও ফুল চাষে মনযোগ দিচ্ছে। আর উপকূলীয় জেলাগুলোতে চাষিরা লবণ সংগ্রহ ও চিংড়ি চাষে মনযোগ দিচ্ছে।
বাংলাদেশে পানি সংকটের অনেক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের পানি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের তথ্য মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া, নদী শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় সেচের পানির পাশাপাশি সুপেয় পানির পরিমাণও কমতে শুরু করেছে। তিস্তা ও ফারাক্কা বাধ উত্তর ও উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের মূল কারণ। এ ছাড়া নদীগুলোতে পলি জমা হয়ে নাব্য কমে যাওয়ার কারণে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবেও মিঠা পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। যেমন মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফের স্তুপ গলে সমদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে লোনাপানির প্রবেশ বাড়ছে। এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, পারদ, লোহা, ক্রোমিয়াম, নাইট্রেট, ফ্লোরাইড ও অন্যান্য ধাতব পদার্থ ও দূষক ইত্যাদিও বিশুদ্ধ পানি সংকটের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিণত করার লক্ষ্যে আমাদের সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে কাজ করছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এক প্রতিবেদনে জানায়, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পাশাপাশি সংস্থাটি সারাবিশ্বের জন্য অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানির স্বল্পতাকে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের ৬৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ পানযোগ্য পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মানসম্মত পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে আরো প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ। প্রতি বছর পানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রোগে, দূষিত পানি পানের কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। এ পরিস্থিতিতে সব মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পানি পাওয়ার অধিকার অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি হবে ভবিষ্যৎ মানবজাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নিরাপদ সুপেয় পানি প্রাপ্তি হবে আগামী বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক : সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

