অর্থনীতিতে ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা জরুরি
সাদেকুর রহমান । সোমবার, ৯ মে ২০২২ । আপডেট ১১:৫০
ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কমছে আমাদের অর্থনীতিতে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত ক্ষতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কমছে। এর মধ্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমায় আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। মাঝখানে রেমিট্যান্স কমায় রিজার্ভ বাড়ার গতি থেমে গিয়েছিল। আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট হওয়ায় এর দাম বেড়ে টাকার মান কমে যাচ্ছে। ফলে কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহ কমা এবং ঋণপ্রবাহ বাড়ায় তারল্য ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাড়তি তারল্যের জোগান দিতে গিয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। এসব মিলে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলোর অবস্থান আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল চার হাজার ৬১৫ কোটি ডলার, যা গড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান। গত সেপ্টেম্বরে ছিল চার হাজার ৬২০ কোটি ডলার। যা ওই সময়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান ছিল। এর আগে করোনার আগে ২০১৯ সালের নয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমান রিজার্ভ ছিল। গত ২৩ মার্চ রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪৩০ কোটি ডলার। যা দিয়ে পাঁচ মাসেরও কম সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতিতে ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানি ও কর্মসংস্থানজনিত ঝুঁকিই বেশি। এখন আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় ও মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে। এই অবস্থায় রিজার্ভ বেশি থাকলে, ব্যাংকে তারল্য প্রবাহ পর্যাপ্ত হলে, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়লে ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হতো। কিন্তু এগুলো হচ্ছে না। এখন বৈদেশিক মুদ্রার অনাকাক্সিক্ষত ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকে সঞ্চয় বাড়িয়ে তারল্য বৃদ্ধি করতে হবে। ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে চাঙ্গা করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক কোনো কোনো নিরাপদ মানদণ্ড অনুযায়ী কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকলেই তাকে নিরাপদ ধরা হয়। তবে মনে রাখা দরকার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নতুন সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে বেড়েছে পণ্যের মূল্য। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশের অর্থনীতিতে সম্প্রতি নতুন ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে চলেছে লাগামহীনভাবে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। মেগা প্রকল্প বা বিনিয়োগগুলো যেন সুশাসনের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে ও সাশ্রয়ীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। আর যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেগুলো থেকে যে আয় আসবে তার প্রাক্কলন এবং সেগুলোর ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলনের মধ্যে যেন সামঞ্জস্য থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে সব প্রকল্পের ঋণ পরিষেবার দায়ভার যেন একসঙ্গে না হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে খরচের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে আরো নতুন নতুন অভ্যন্তরীন ও বৈশ্বিক সংকটে পড়তে পারি আমরা। সেরকম চিন্তা মাথায় রেখে এখন থেকে সাবধানতা অবলম্বন করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয় কোনোভাবেই সীমা অতিক্রম না করে সেদিক খেয়াল রাখতে হবে।
ইউডি/সুস্মিত

