সিআরবিতে হাসপাতাল নয়, পরিবেশ রক্ষা করতে হবে

সিআরবিতে হাসপাতাল নয়, পরিবেশ রক্ষা করতে হবে

আশিকুর রহমান । বুধবার, ১৮ মে ২০২২ । আপডেট ১০:৫০

চট্টগ্রাম (ঐতিহাসিক নাম: পোর্টো গ্র্যান্ডে এবং ইসলামাবাদ) বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বন্দরনগরী নামে পরিচিত এই শহরটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাহাড়, সমুদ্রে এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে বিখ্যাত।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরের অতি প্রাচীনতম স্থাপনার নাম সি.আর.বি পূর্ণ রূপ হচ্ছে সেন্ট্রাল রেলওয়ে ভবন। কালজয়ী ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে সিআরবি ভবন চট্টগ্রাম ঠিক তেমনি নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা স্বস্তি, আরাম আর মানসিক প্রশান্তির খোঁজে সময় পেলে মানুষ জমায়েত হয় এই সিআরবি শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে। পুরো এলাকায় দৃষ্টিনন্দন আঁকা-বাঁকা, সর্পিল রাস্তা উঁচু নিচু সবুজ পাহাড় টিলা, বন-বনানী ছায়া সুনিবিড় এই বিরাট এলাকাটি অঘোষিত ভ্রমনের জায়গা হিসেবে যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রামের মানুষদের দিয়ে আসছে বিনোদনের আস্বাদন।

১৮৬২ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার তদানিন্তন পূর্ববঙ্গের দর্শনা থেকে জাগতি পর্যন্ত ৫৩.১০ কি.মি. ব্রডগেজ রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে এতদ্বাঞ্চল রেলপথের গোড়াপত্তন করে। ১৮৯১ সালে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে তখন ১৬/১১/১৮৯২ইং, গেজেটমূলে ফেনী থেকে রেলওয়ে চট্টগ্রামের বটতলী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যই কেন্দ্রীয় রেল ভবন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন সুবিধাকে রেলওয়ের সাথে সমন্বিত করার প্রয়াসেই ১৮৯৯ইং সালে সি.আর.বি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ভবনের দক্ষিণ দিকে বিরাট আঙিনায় দায়সারা গোছের ফুলের বাগান দেখলে অব্যবস্থাপনার ছাপ ফুটে উঠবে। সি.আর.বির পূর্ব দিকে রাস্তার পূর্ব পার্শ্বে রেলওয়ে হাসপাতাল অবস্থিত। এটা একসময় ছিল ফিরিঙ্গি অফিসারদের ক্লাব, কর্মক্লান্ত কর্মকর্তারা কাজের বাইরের সময়টুকু এখানে আমোদ-প্রমাদ করে কাটাতেন, আড্ডা দিতেন, নিজ দেশে ফেলে আসা আত্মীয়স্বজনের গল্প করতেন। গেল চার/পাঁচ বছর ধরে সি.আর.বি পাহাড়ি জনপদের এ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশ ও পাহাড়ের তলদেশে বাঙালির সর্ববৃহৎ বৈশাখী উৎসব, বসন্ত উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী সাহাবুদ্দিনের বলীখেলায় লক্ষাধিক লোকের জমায়েত ঘটে। বলা যেতে পারে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামে সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র এই সি.আর.বি।

সিআরবির এই প্রস্তাবিত ক্যান্সার হাসপাতাল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর আওতায় একটা প্রকল্প করার চিন্তাভাবনা করে। এই প্রকল্পের আওতায় এইখানে একটা ক্যান্সার হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হবে। ৫০ বছরের জন্য এই হাসপাতাল ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকবে, মানে এইক্ষেত্রে মালিক হবে ইউনাইটেড আর রেলওয়ে। এই প্রকল্প নিয়ে বিরোধীতা করেন চট্টগ্রামে সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে নানান শ্রেণী পেশার মানুষের লাগাতার বিক্ষোভ-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ জালাল মিশুক বলেন, চট্টগ্রামে ঢাকার মতো রমনা পার্ক কিংবা বোটানিক্যাল গার্ডেন নেই। গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত নয়নাভিরাম এই উন্মুক্ত পরিসরটিও যদি না থাকে, নগরীর সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়! আমরা হাসপাতাল নির্মানের বিপক্ষে নই। চট্টগ্রামে রেলওয়ের অনেক খালি জায়গা আছে, যেখানে হাসপাতাল করা যায়। কিন্তু যে কোনো মূল্যে সিআরবির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হবে।

সিআরবিতে শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন করার সুযোগ নেই। এটি করা হবে না। পরিবেশের ক্ষতি করে কোন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে না। রেলওয়ের সাথে যৌথভাবে বেসরকারি একটি হাসপাতাল গড়ে তোলার ব্যাপারে যেসব কথা বার্তা বলা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে আরো আলাপ আলোচনা হবে। চট্টগ্রামের মানুষের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে সরকার কোন ধরনের আপোষ করবে না।

সরকার পরিবেশের ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ। বৃক্ষ রক্ষার ব্যাপারেও সরকারের আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছার কোন ঘাটতি নেই। এমন জনবান্ধব এবং পরিবেশ বান্ধব সরকারের সময়কালে শতবর্ষী বৃক্ষ কোনভাবেই নিধন হবে না। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই কল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত নেবেন । আমাদের অবশ্যই একটি হাসপাতাল চাই। আমাদের হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। চট্টগ্রামে সরকারি বেসরকারিখাতে ভালো হাসপাতালের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের জন্য শতবর্ষী বৃক্ষ নিধন মেনে নেয়া যায় না। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে হাসপাতাল বানানো হবে না। পরিবেশ রক্ষা করে কিভাবে হাসপাতাল বানানো যায়, কিভাবে হাসপাতালটিকে সাধারণ মানুষের কাজে লাগানো যায় ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, হাসপাতালের জন্য সরকার পরিবেশের ক্ষতি করবে না। বাংলাদেশ রেলওয়ে তাদের কোন প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন ধরনের এনওসি বা অনুমোদন নেয় না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(সিডিএ) চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ। চট্টগ্রামে হাসপাতালের অভাব রয়েছে। তাই হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই হাসপাতালের জন্য সরকার নিশ্চয় পরিবেশের ক্ষতি করবে না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading