অমর্ত্য সেন: বাঙালি অর্থনীতিবিদের বিশ্বজয়ের গল্প
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৩ মে ২০২২ । আপডেট ১৪:৫৫
১৯৯৮ সালে পুরো দুনিয়া নড়েচড়ে বসেছিল একজন বাঙালির নাম শুনে, ‘অমর্ত্য সেন’। সেবার অর্থনীতিতে প্রথম বাঙালি হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরার সুবাদে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তার দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের মতো বিষয় ভালো করে বোঝার আগ্রহ জন্মে খুব ছোটবেলাতেই। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক।
বিগত কয়েক দশক ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছেন এই অর্থনীতিবিদ। বিশ্বজুড়ে বৈষম্য ও অসমতার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কী কী করা যেতে পারে তা নিয়ে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকার বোস্টনে বসবাস করছেন আর ল্যামন্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সংক্ষেপে অমর্ত্য সেন
ইন্ডিয়ার প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, লেখক এবং দার্শনিক অমর্ত্য সেন। তিনি সমাজের অনগ্রসর ও দরিদ্র অংশের জন্য ন্যায়বিচার, সম্মান ও সাম্যের পথ উন্মুক্ত করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি অনাহার এড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি উপায় উল্লেখ করেছিলেন, যা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী সূচক গঠনে সহায়তা করেছিল এবং তাকে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের প্রভাবশালী ৫০ জন ব্যক্তির একজন করে তুলেছে। তার গবেষণার বিষয়গুলি ছিল সামাজিক তত্ত্ব, অর্থনৈতিক তত্ত্ব, নীতি ও রাজনৈতিক দর্শন, কল্যাণ অর্থনীতি তত্ত্ব, উন্নয়নমূলক অর্থনীতি ইত্যাদি।
শৈশব এবং পারিবারিক জীবন
১৯৩৩ সালে ৩রা নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন অমর্ত্য সেন। তিনি পশ্চিম বাংলার শান্তিনিকেতন জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন আশুতোষ সেন, তিনি একজন ঢাকার রসায়ন অধ্যাপক যিনি পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হন এবং মা অমিতা সেন। তাদের পৈতৃক বাড়ি ঢাকায়।
অমর্ত্য সেনের শিক্ষা জীবন
১৯৪১ সালে অমর্ত্য সেন ঢাকার সেইন্ট গ্রেগরী উচ্চ বিদ্যালয় পড়াশুনো করেন। দেশ ভাগের পর তার পরিবার পরে ইন্ডিয়ায় চলে যান। সেখানে বিশ্বভারতী বিদ্যালয় ভর্তি হন। শৈশব থেকেই অমর্ত্য সেনের সংস্কৃত, গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে আগ্রহ ছিল। ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণীর সম্মান সহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই বছর তিনি কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে যান এবং ১৯৫৬ সালে বি.এ ডিগ্রী অর্জন করে।
অমর্ত্য সেনের ক্যারিয়ার
১৯৫৬ সালে, ২৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক এবং প্রধান হিসাবে নিযুক্ত হন। দুই বছর পর, তিনি পিএইচডি করার জন্য ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলেন। ১৯৫৯ সালে তিনি পিএইচডি থেসিস শিরোনাম “দ্যা চয়েজ অফ টেকনিকস” জমা দেন। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লী স্কুল অফ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। এরপর ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে অর্থনীতি ও দর্শন পড়িয়েছেন।
১৯৭০ সালে তার প্রথম গ্রন্থ ‘সামগ্রিক আগ্রহ এবং সামাজিক উন্নয়ন’ যা মৌলিক কল্যাণ, সাম্যতা এবং স্বতন্ত্র অধিকার, ন্যায়বিচার বিষয়গুলিকে সম্বোধন করে। যা তার অন্যতম প্রভাবশালী মনোগ্রাফ হিসাবে বিবেচিত। যার কারণে গবেষকদের মনোযোগ বুনিয়াদি কল্যাণের দিকে যায় এবং তারা এর থেকে অনুপ্রেরণা পান। ১৯৭৩ সালে তার প্রকাশিত বই ‘অর্থনীতিতে অসমতা’ বইটি অর্থনৈতিক বৈষম্যের অধ্যয়নের সাথে সম্পর্কিত কল্যাণ অর্থনীতি তত্ত্বের একটি গবেষণা।
১৯৮২ সালে প্রকাশিত নিবন্ধ ‘দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ’। এই নিবন্ধটিতে খাদ্য সরবরাহের অপ্রতুলতার কারণ, অপুষ্টি এবং দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণের কারণ তুলে ধরেছিলেন। ১৯৮৭ সালে তার প্রকাশিত “নীতিশাস্ত্র ও অর্থনীতিতে”। এটি একটি সমালোচনামূলক রচনা ছিল। কল্যাণ অর্থনীতি এবং আধুনিক নীতিশাস্ত্রের পড়াশোনা একে অপরকে উপকৃত করতে পারে এই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল। ১৯৯০ সালে সালে নিউইয়র্ক রিভিউ অফ বইয়ের জন্য তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন যার শিরোনাম “১০ কোটির অধিক নারীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না”।
১৯৯২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস দ্বারা প্রকাশিত তার অসমতার পুনঃপরীক্ষণ বইটি অসমতার ধারণার পরীক্ষা করে এবং মূলত সামর্থ্য পদ্ধতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং টমাস ডব্লিউ ল্যামন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবেও কাজ করছেন।
অমর্ত্য সেন সমাজে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাসকারী সংখ্যাকে দারিদ্র্যের মান হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন এবং যে কোনও সম্প্রদায়ের দারিদ্র্যের মাত্রা মাপার জন্য একটি জটিল সূচকও তৈরি করেছিলেন।
তার প্রকাশনা ‘স্বাধীনতার মতো উন্নয়ন’ অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ১৯৯২ সালে তার ‘অসাম্যতা পুনরায় পরীক্ষিত’ একটি প্রশংসিত বই। যা এক দশকের তার কাজের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ থিমকে একত্রিত করেছে। এই বইয়ে তিনি অসমতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগকে সম্বোধন করেছেন।
নীবেল প্রাপ্তি ও অন্যান্য সম্মাননা
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করার পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বিভিন্ন সময়ে অনেক মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননাও পেয়েছেন। ১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়া সরকার অমর্ত্যকে ‘ভারতরত্ন’ দিয়ে পুরস্কৃত করেন এবং বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেন। ২০১১ সালে ন্যাশনাল হিউম্যানিটিস মেডেলে ভূষিত হন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আমেরিকার নাগরিক না হয়েও এই মেডেল লাভ করেন।
একই বছর বাংলা একাডেমি অমর্ত্য সেনকে বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক হিসেবে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। ২০১৭ সালে জোহান স্কিট প্রাইজ ইন পলিটিক্যাল সায়েন্স এবং ২০১৯ সালে ব্রিটেনের বিখ্যাত বডলে মেডেলে ভূষিত হন নোবেলজয়ী এই বাঙালি অর্থনীতিবিদ।
ইউডি/অনিক

