নৈতিক অবক্ষয়ের করালগ্রাসে নিপতিত আমাদের যুবসমাজ
সিকান্দার মির্জা । সোমবার, ২০ জুন ২০২২ । আপডেট ১৬:১৫
একুশ শতকের বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী দেখা যাচ্ছে তা হলো তরুনদের মাঝে নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার। দিন দিন এটা মহামারীর মত বেড়েই চলেছে। একটা দেশের এবং জাতির শক্তিশালী সম্পদ হচ্ছে যুবসমাজ আর ওদের এই অবক্ষয় একদিনে তৈরী হয়নি। এই নৈতিক অবক্ষয়ের মূল কারন হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকের বিস্তার, আকাশ সংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল, বেকারত্ব্ ওদের যথাপোযুক্ত মূল্যায়ন না করা।আমরা সবাই জানি,আজকের তরুণরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। অর্থাৎ যুবসমাজই পারে শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দেশকেস্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যুবসমাজ এখন বিপথে পরিচালিতহচ্ছে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত। যুবসমাজের অবক্ষয় জাতির বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। গোটাসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। আর এই সমস্যার প্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। একটি সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যত সম্পদ হলো তরুণ সমাজ। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি-সমৃদ্ধি নির্ভর করে তরুণ সমাজের ওপর। যেকোনো জাতির প্রাণশক্তি তাদের যুবসমাজ।
যুবসমাজই জাতির আশা-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক। যুবসমাজ যেকোনো দেশ ও জাতির সোনালি স্বপ্ন। আজকের যুবকরাই পরিচালনা করবে আগামীর সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতিকে। যুবকদের প্রেমময় রূপ ও শক্তির কারণে দরিদ্র, নিঃসহায় প্রবঞ্চিত ও নিগৃহীত জনতা লাভ করবে নতুন জীবন, প্রদীপ্ত হবে নব উদ্দীপনায়। কিন্তু সম্প্রতি সেই যুবসমাজের প্রতি তাকালে জাতিকে অবাক হতে হয়। কারণ দেশ ও জাতির কর্ণধার সেই যুবসমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের অনেকেরই নৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নেই। এই যুবকদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত, কেউ অসামাজিক, কেউ চাঁদাবাজি, কেউ অস্ত্রবাজি, কেউ চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, প্রভৃতি অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত। যুবসমাজ স্বভাবতই অগ্রসর হতে চায়, চায় কর্মব্যস্ততা। কিন্তু আজ তাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার সব পথ রুদ্ধ, কর্মহীনতার অভিশাপে কেহ কেহ রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনীতিকদের স্বার্থবাদিতায় প্রভাবিত হয়ে তাদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ শুরু করে। স্বভাবতই শৃঙ্খলাবোধ হারিয়ে হিংস্র রাজনৈতিক পরিমন্ডলে আশ্রয় নিয়ে যুবসমাজ উচ্ছৃঙ্খলতার কলঙ্কের বোঝা মাথায় বয়ে চলছে।
নানাবিধ কারণে যুবসমাজের এই অবক্ষয় হতে পারে, যেমন-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি, শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য, চাকরিক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা, অপসংস্কৃতি, অভিভাবকদের আদর্শহীনতা, সমাজপতিদের অনৈতিকতা, অর্থ, অস্ত্র ও ক্ষমতার লোভ এবং বেকারত্ব। সেই যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে নিপতিত করছে। আমাদের যুবসমাজ আজকে শৃঙ্খলাহীন এক অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা এমন এক রীতিনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে, যা তাদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবন বিকাশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। দেশের যুবসমাজের মধ্যে যেসব নৈতিক অবক্ষয় অনুপ্রবেশ করেছে, তার মূলে রয়েছে অবাধ দুর্নীতি। সম্প্রতি সত্য ও সুন্দরের পথ ত্যাগ করে যুবসমাজ উগ্র ও বিকৃত জীবন যাপনে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে এবং চরম অবক্ষয়ের মধ্যে জীবন খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাদের যুবসমাজ আজ এ অপসংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। আমাদের সমাজের জনগণের অসচেতনতা, অশিক্ষা, অজ্ঞতা, আইন প্রয়োগে শিথিলতা ও দুর্নীতি, ইত্যাদির কারণে এই নৈতিক অবক্ষয়ের করালগ্রাসে নিপতিত হচ্ছে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ।
বেকারত্ব, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক কুপ্রভাব, অপসংস্কৃতি, অর্থনৈতিক দৈন্য যুবসমাজকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে তারা সুস্থ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুঁকে পড়ছে নানা অবক্ষয়ের দিকে। আমাদের যুবসমাজ বড়দের মধ্যে খুব কমই আদর্শবান মানুষ খুঁজে পাচ্ছে, যাদের থেকে তারা অনুপ্রেরণা পাবে। তারা অহরহ দেখছে রাজনীতির নামে মিথ্যাচার, সমাজ সেবার নামে সেচ্ছাচার, আদর্শের নামে প্রতারণা।সমাজের সর্বস্তরে মূল্যবোধের এই অবক্ষয়ের শিকার আমাদের যুবসমাজ, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা যুবসমাজকে বিপথগামী করার ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী। অসুস্থ ছাত্র রাজনীতি নামধারী সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ ছাত্ররা। আর তাই এখনি নিতে হবে সময়োপযুক্ত পদক্ষেপ, শিক্ষাঙ্গনকে করতে হবে সুশিক্ষার কারখানা। সব প্রকার মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, উৎপাদন, বিক্রয় নিষিদ্ধ করে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, দুর্নীতিকে সর্বক্ষেত্রে পরিহার করতে হবে। সব প্রকার মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ করতে হবে।
যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে দেশে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যতার মধ্যে মাথা উঁচু করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। যুবসমাজই দেশের প্রাণশক্তি, তাদের বিপথগামীতার অর্থ হলো গোটা জাতির ধ্বংস। তারাই জাতির আশার প্রতীক। তাদের উদ্ধার করতে হবে অবক্ষয়ের অতল গহ্বর থেকে। তা না হলে গোটা জাতি অবক্ষয়ের সাগরে ডুবে মরবে। মানব সভ্যতায় যুবসমাজের রয়েছে মুখ্য ভূমিকা। তাই তাদের দিকে বাড়িয়ে দিতে হবে স্নেহের হাত। ওদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিচালিত করতে হবে সঠিক পথে। ওদের বোঝাতে হবে যে, ওদের দিকে চেয়ে আছে গোটা দেশ ও জাতি। তাই শুধু সরকার নয়, এই সমাজকেও বাড়িয়ে দিতে হবে ওদের দিকে সহানুভূতির হাত। তবেই রক্ষা করা যাবে যুবসমাজ আর বাঁচবে দেশ। বয়ে আনবে সমাজের জন্য কল্যাণ।
লেখক- সমাজ বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

