সচেতনতা ব্যতীত পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব
নূর হোসাইন মোল্লা । সোমবার, ২০ জুন ২০২২ । আপডেট ১৭:১০
বর্তমান যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে যে ব্যাপারগুলো, তাদের মধ্যে পর্নোগ্রাফি অন্যতম। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পর্নোগ্রাফি হাল আমলের কোনো বস্তু নয়। মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে, বিশেষত যখন থেকে মানুষ শিল্প-সাহিত্যে তাদের মনের ভাব প্রকাশের যোগ্যতা অর্জন করেছে, তখন থেকে মানব শরীরের প্রতি নিজেদের আকর্ষণকে তারা ব্যক্ত করার চেষ্টা করে এসেছে। আর এভাবেই জন্ম হয়েছে পর্নোগ্রাফির।
পর্ণগ্রাফি দেশের যুব সমাজের জন্যে এক ঘাতক ব্যাধি। এটা নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের অধিকাংশ যুবক-যুবতী এ ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যুব সমাজ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে পর্ণগ্রাফি কি? পর্ণগ্রাফি আইনে বলা হয়েছে, পর্ণগ্রাফি হচ্ছে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোন অশ্লীল সংলাপ, অভিনয় অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য যা চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য কোন উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যার কোন শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই। যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল বই, ম্যাগাজিন,ভাস্কর্য, কল্পমূর্তি, কার্টুন যা অনেকে ট্রল করে বা লিফলেট। পর্ণগ্রাফি তথা নগ্নতা সম্পর্কে প
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন -২০১২ এর ৮ নং ধারায় পর্ণগ্রাফির নিন্মরূপ শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
৮ (১) নং ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি পর্ণগ্রাফি উৎপাদন করার জন্যে অংশ গ্রহণকারী সংগ্রহ করার চুক্তিপত্র করলে বা কোন নারী বা পুরুষ বা শিশুকে অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য করলে সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দন্ডে দন্ডিত হবে।
৮( ২) নং ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি পর্ণগ্রাফির মাধু অন্য কোন ব্যক্তির সামাজিক বা ব্যক্তির মর্যাদা হানি করলে বা ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করলে বা কোন সুবিধা আদায় করলে বা ব্যক্তিকে ধারণকৃত ভিডিও দিয়ে মানসিক নির্যাতন করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে। ৮( ৩) নং ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট বা মোবাইল ফোন বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্ণগ্রাফি সরবরাহ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে।
অন্যান্য দেশের যুবসমাজের মতো, আমাদের দেশের যুবসমাজের অবক্ষয়ের পেছনেও একটি বড় কারণ হলো পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি। এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে অবশ্যই ইন্টারনেট। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। প্রতি বছর দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে গুগলে সবচেয়ে বেশি বার সার্চ দেয়া কি ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকে বিভিন্ন বিদেশী পর্নতারকাদের নাম। এছাড়া দেশী কোনো তারকার ‘স্ক্যান্ডাল ভিডিও’ ফাঁসের খবর রটলে, তারাও থাকেন এ তালিকায়। গুগলে বিভিন্ন নারী আত্মীয়ের নাম কি ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ দিলেও, সেখানে দেখা পাওয়া যায় বিভিন্ন পর্নোগ্রাফিক/এরোটিক পোস্টের সমাহার।
পর্ণগ্রাফি ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ নাই বললেই চলে। মহিলারা মায়ের জাতি, সেই মায়ের জাতির উলঙ্গ মূর্তি স্থাপিত আছে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ প্রাঙ্গণে। পরিতাপের বিষয়, সরকার আজ পর্যন্ত সেই উলঙ্গ মূর্তি অপসারণ করেন নি। সরকারের উচিত এ মূর্তিটি অপসারণ করে পর্ণগ্রাফি তথা নগ্নতা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। যুবসমাজকে সঠিক পথে ফেরাতে কেবল এধরনের কাজই যথেষ্ট নয়। যুবসমাজকে রক্ষার্থে মাদকের বিরুদ্ধেও সমান সোচ্চার হতে হবে। পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সাহিত্যচর্চা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসে যোগদানে উৎসাহিত করা উচিত। সর্বোপরি, বেকারত্ব যেন যুবসমাজের হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাসের কারণ হতে না পারে, সেজন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও জরুরি। পাশাপাশি পরিবারের শিশু বা ছোটরা ইন্টারনেট কীভাবে বা কোন কাজে ব্যবহার করছে সেদিকেও বাবা-মা, বড় ভাই বোনদেরও নজর রাখা উচিত। তাছাড়া সম্মিলিত সচেতনতা ব্যতীত পর্নোগ্রাফির অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

