উইলিয়াম কেরী: বাংলা সাহিত্যে গদ্যরীতির প্রবর্তক

উইলিয়াম কেরী: বাংলা সাহিত্যে গদ্যরীতির প্রবর্তক

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:০৫

বাংলা সাহিত্যে গদ্যরীতির প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত উইলিয়াম কেরী। বর্তমান বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে তার অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। তিনিই পদ্যের গঠনে বাংলা ভাষা রীতির প্রচলন ভেঙে গদ্য ব্যবহার শুরু করেন। তিনি এ অঞ্চলে কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বাংলা ভাষায় বেশ কিছু পুস্তক রচনা করেন। যার মধ্যে গদ্য ছাড়া, পদ্য ও গীতিও রয়েছে। উইলিয়াম কেরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন সাইফুল ইসলাম

উইলিয়াম কেরী প্রথম বাংলা সাহিত্যে গদ্যরীতির প্রবর্তন। তিনিই পদ্যের গঠনে বাংলা ভাষা রীতির প্রচলন ভেঙে গদ্য ব্যবহার শুরু করেন। তিনি বাংলা হরফের সংস্কার, অন্যান্য ইন্ডিয়ান ভাষার হরফ তৈরি করেন। রচনা করেন বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা-ইংরেজি অভিধান।

প্রাক কথা
এডমন্ড ও এলিজাবেথ কেরির পাঁচ সন্তানের মধ্যে উইলিয়াম কেরী ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। তার পিতামাতা ছিলেন নরদাম্পটনের পলারসপ্যুরি গ্রামের তন্তুবায়। বাল্যকাল থেকেই প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, বিশেষত উদ্ভিদবিদ্যায় কেরির গভীর আগ্রহ ছিল। স্বচেষ্টায় তিনি লাতিন শিখেছিলেন।

কেরী সাহেবের এদেশে আগমন
১৭৯৩ সালের ১৩ জুন উইলিয়াম কেরী তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ফিলিক্স, স্ত্রী ও কন্যাসহ ইন্ডিয়ান উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ১১ নভেম্বর তিনি ও তার সহযাত্রীগণ কলকাতায় অবতরণ করেন। তখন তার বয়স মাত্র ৩১ বছর। এখানে তিনি একটি অবৈতনিক দৈনিক পাঠশালা খোলেন ১৭৯৩ সালে। এ সময় তিনি হিন্দু মুসলমান যুবকদের জন্যে মদনাবাটিতে একটি এবং রামপাল দীঘিতে একটি কলেজ স্থাপন করার চিন্তা প্রকাশ করেন।

১৭৯৬ সালের গ্রীষ্মে উইলিয়াম কেরী ৩ বৎসরের কম সময়ের মধ্যে বাইবেলের নতুন নিয়মের অনুবাদ প্রায় শেষ করেন। পেন্টাটিউকের এর বেশ খানিকটা অংশও তিনি এ সময় অনুবাদ করেন। ১৭৯৮ সালে তিনি শ্রীরামপুর ছাত্রাবাস স্থাপন করেন। ১৮০০ সালের ৫ মার্চ সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় নতুন নিয়ম ছাপিয়ে প্রকাশ করেন। এটিকে বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও এ বছর তিনি বালকদের জনে প্রথম অবৈতনিক দৈনিক স্কুল স্থাপন করেন এবং পুরাতন নিয়মের মাত্র দুটো পুস্তক ছাড়া সম্পূর্ণ বাইবেল অনুবাদ শেষ করেন।

কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা ভাষার শিক্ষক নিযুক্ত হন ১৮০১ সালের মে মাসে। আগস্ট মাসে কেরীর লেখা কথোপকথন প্রকাশিত হয়। বাংলা ব্যাকরণ বইটি প্রকাশিত হয় ১৮০৬ সালের হিন্দি, উড়িয়া, মারাঠি ও সংস্কৃত ভাষায় নতুন নিয়ম অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। ফলে কেরীর জীবিত অবস্থায় ৩৪টি ভাষায় সম্পূর্ণ বাইবেল অথবা বাইবেলের অংশ বিশেষ অনূদিত হয়। এ বছরই এশিয়াটিক সোসাইটি তাকে সভ্যপদ দান করে। বাউন ইউনিভার্সিটি তাকে সম্মান সূচক ডক্টর অফ ডিভিনিটি ডিগ্রি প্রদান করে ১৮০৭ সালে। এ বছর তার প্রথম স্ত্রী ডরোথী প্লাকেট রোগে মৃত্যুবরণ করেন। পরের বছর তিনি সার্লট রুউমোরকে বিয়ে করেন।

কর্ম ও সাহিত্য
১৮০৯ সালে পূর্ণাঙ্গ বাইবেলটি বাংলা ভাষায় ছাপানো হয়। এছাড়াও এ সময় অনুবাদ কাজে তার যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়। ১৮১২ সালের ১১ মার্চ সন্ধ্যায় তার প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর ছাপাখানায় আগুন লাগে। এতে পুস্তক, অনুলিপি, টাইপসহ অনেক মূল্যবান সম্পদ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এ সংবাদ কলকাতা পৌঁছাবার পর এক সপ্তাহের মাঝে সেখান থেকে আট হাজার দুইশত টাকা সংগৃহীত হয়েছিল। ইংল্যান্ডে খবর যাবার দুই মাসের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়। এ বছরই কেরীর ইতিহাসমালা পুস্তকটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে ১৫০টি শিরোনামের নানা স্থানের ১৪৮টি গল্প মুদ্রিত হয়।

উপমহাদেশের জনসাধারণের জন্যে বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ক প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করেন ১৮১৪ সালে। দেশীয় ছাত্রদের মাঝে পুস্তকের অভাব মেটানোর উদ্দেশ্যে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি স্থাপিত হয় ১৮১৭ সালে। উইলিয়াম কেরী র নেতৃত্বে ৪ জন বাঙালী হিন্দু, ৪ জন মৌলভী ও বাকি ১৬ জন ইউরোপীয় নিয়ে এর পরিচালক সমিতি গঠিত হয়। ১৮১৮ সালে তিনটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এগুলো হচ্ছে দিকদর্শন নামে একটি বাংলা মাসিক, সমাচার দর্পণ নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক এবং ‘ফ্রেন্ডস অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি ইংরেজী সাপ্তাহিক।

এ বছর শ্রীরামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুল পরিচালনার জন্য কলকাতা স্কুল সোসাইটি স্থাপিত হয়। স্কুল কলেজের জন্যে পাঠ্য পুস্তক প্রণয়নের জন্যেও কেরী কাজ শুরু করেন। ইন্ডিয়াতে স্ত্রী শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে এবং সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে তিনি বিশেষভাবে তৎপর হন। ১৮১৯ সালের বড়লাট পত্নী লেডি হেস্টিংসের উৎসাহে উইলিয়াম কেরী সর্বপ্রথম কৃষি সমিতি স্থাপন করেন। কয়েকটি স্থানে এই সমিতির আদর্শ কৃষি উদ্যান ছিল। কেরীর দ্বিতীয় স্ত্রী সার্লট মারা যান ১৮২১ সালে।

জীবনে প্রতিঘাত ও জীবনাবসান
১৮৩২ সালে ৭১ বছর বয়সেও কেরী নিয়মিত প্রচার বাংলা ইংরেজীসহ ইন্ডিয়ার বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য চর্চা বক্তৃতা ও বাইবেল অনুবাদ অব্যাহত রাখেন। উইলিয়াম কেরী নামের বাংলা প্রেমিক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের মহান কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮৩৪ সালের ৯ জুন ৭৩ বছর বয়সে। তাকে সমাহিত করা হয় শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীদের সমাধি ক্ষেত্রে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading