পর্যটনশিল্পের বিকাশে গতিশীল হোক অর্থনীতি
মাহমুদুল হাসান মিল্টন। শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৩৫
বৃহৎ এ ব-দ্বীপ বাংলাদেশ পুরোটাই সৌন্দর্যের এক অপার আধার। যেখানেই চোখ মেলে তাকাই সেখানেই সবুজ শ্যামল চোখ জুড়ানো দিগন্তে হারিয়ে যাই প্রতিনিয়ত। দেশের প্রতিটি মানুষের মতো অন্যান্য দেশের মানুষেরও অন্যতম আকর্ষণীয় এক স্থান বাংলাদেশ। এ দেশে ব্যাগ বাটরা নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো জায়গার অভাব নেই। এখানে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বিশাল বিস্তৃতি, ঝর্ণা, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ের হাতছানি। এ ছাড়া অন্যতম আকর্ষণ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা নারিকেল জিঞ্জিরা। আরও রয়েছে নয়নাভিরাম চা বাগান। তাই এ দেশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস লিখেছেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। আহা এমন সৌন্দর্য রেখে আর কোথাও যেতে মন চাইবে না। এখানকার পড়ন্ত দুপুরে ঘুঘুর ডাকে ঘুম ভাঙানোর মনোহর দৃশ্য আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। এই সৌন্দর্যের টানে এমন সব জায়গায় দেখা মেলে হরেক রকম মানুষের যারা ঘুরতে ভালোবাসেন, অজানা-অচেনা কিছু আবিষ্কারে মন নেচে ওঠে তাদের।
ঠিক এভাবেই সৌন্দর্যের টানে গড়ে ওঠে কোনো দেশের পর্যটনশিল্প। পর্যটনশিল্প এখন যে কোনো দেশের প্রধান আকর্ষণী বস্তু। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষ এসে ভিড় জমায় এ সব স্থানে এবং সে দেশের ভান্ডারে জমা হতে থাকে বৈদেশিক মুদ্রা। কোনো দেশের পর্যটনশিল্প তত বেশি উন্নত যত বেশি সে দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা বিদ্যমান এবং হাতের নাগালে সব নাগরিক সুবিধা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে পোশাক, চা বা পাটশিল্পের মতোই পর্যটনশিল্প একটি বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হতে পারে। কিন্তু দিনকে দিন এখানকার অবস্থা আরও নাজুক হচ্ছে। কিছুদিন আগে সিলেটের জাফলং-এ স্বেচ্ছাসেবক কর্তৃক পর্যটকদের প্রহার আরও নিরুৎসাহিত করছে মানুষের। পাশাপাশি হোটেল রিসোর্টগুলোতেও নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা। নিরাপত্তাব্যবস্থায় উন্নত দেশগুলো এগিয়ে থাকায় তারা পর্যটনেও শীর্ষে।
সুযোগ বুঝে কোপ মারার স্বভাব এ দেশের কতিপয় নীতিহীন মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছে। গেল বছর আলু ভর্তা এবং ডাল-ভাত কিনতে হয়েছে ৩০০ টাকায় যার নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ সব ব্যবসা মনোভাবের কারণে পর্যটকদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে ঘুরতে যাচ্ছেন, যার ফলে এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফেসবুককেন্দ্রিক ভ্রমণপিপাসুদের বিভিন্ন পেজ ও গ্রম্নপে পর্যটকদের ক্ষোভ প্রকাশ যেন একটা অশনি সংকেতের বার্তা দেয়। এভাবে চলতে থাকলে একটা সম্ভাবনাময় শিল্পের সলিল সমাধি হবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান বিঘ্নিত হবে। পর্যটনশিল্প বিকশিত হওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে যানবাহন ব্যবস্থা। জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি উন্নত সেবা দিতে পারলে বিশ্ববাসীর নজরে আসবে বাংলাদেশ। আরেকটি ব্যাপারে মনোনিবেশ করতে হবে তা হলো বর্জ্যব্যবস্থাপনা এবং সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ। কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। সমুদ্র সৈকত নোংরা হয়ে থাকছে এবং গবাদিপশুর চারণভূমিও হতে দেখা গেছে যা এ শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। নিরাপত্তা যেমন জোরদার করতে হবে তেমনি রক্ষা করতে হবে সুন্দর পরিবেশের নিশ্চয়তা। এখনই সময় এই শিল্পকে একটি অর্থনৈতিক খাত হিসেবে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে প্রকৃতিনির্ভর জীবন পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ফলে এই শিল্পের পরিকল্পিত বিকাশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, পুরাকীর্তি ও প্রত্নতত্ত্ব, ক্ষুদ্র জাতীগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনধারা ইত্যাদি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে নিসর্গমণ্ডিত হওয়ায় শুধু দেশি নয়, বিদেশি পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। যুগ যুগ ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। পর্যটনকে শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করায় বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ যদি পর্যটনের বাজারে টিকে থাকতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরে বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতির রূপরেখা।
ইউডি/সুপ্ত

