বছরে জমছে ২ লাখ টন বর্জ্য : মিনিপ্যাকে বড় সর্বনাশ
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৩০
দেশে প্রতি বছর ১০ লাখ ৬ হাজার টন ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু মিনিপ্যাক বর্জ্যই রয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ১০৪ টন। যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এমন শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত
প্লাস্টিক পণ্যের মিনিপ্যাক দেশব্যাপী ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ছোট-বড় যে কোনো দোকানেই মিলবে এসকল মিনিপ্যাকে মোড়ানো পণ্য। প্রতিদিন কোটি কোটি মিনিপ্যাক ব্যবহৃত হচ্ছে নিত্যদিনের পণ্যে। আর তা থেকে পণ্য ছাড়িয়ে বর্জ্য হিসেবে পড়ে থাকছে পরিবেশের সঙ্গে। শ্যাম্পু থেকে শুরু করে আচার, চানাচুর, পাউরুটি, বিস্কুট, মসলা, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন পণ্যে এখন মিনিপ্যাকের ব্যবহার বাড়ছে। অপচনশীল এই মোড়ক মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, প্লাস্টিক স্যাশে পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শনিবার (২ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় এই গোলটেবিল বৈঠকে ‘প্লাস্টিক স্যাশে: স্মল প্যাকেট উইথ হিউজ এনভায়রনমেন্ট ডেস্ট্রাকশন’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। জানা গেছে, ২০১০ সালে পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যাগ বা মোড়ক ব্যবহারে আইন হয়। কিন্তু পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পণ্যের মিনিপ্যাক মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে। এগুলো বর্জ্য হিসেবে পরিবেশ বিষাক্ত করার পাশাপাশি রাজধানীর বেশির ভাগ নালা ও খালের পানি যাওয়ার পথ আটকে দিচ্ছে।
দিনে ১২ কোটি ৯০ লাখ মিনিপ্যাকের ব্যবহার : দেশের মানুষ দিনে প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ প্লাস্টিকের স্যাশে ব্যবহার করে। ২০২১ সালের ২১ জুন থেকে ২০২২ সালের ২২ মে দেশে প্রায় ১০ লাখ ৬ হাজার টন ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে। দেশে কী পরিমাণ মিনিপ্যাক ব্যবহার হচ্ছে সে বিষয়ে গবেষণা-তথ্যের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার বেশ কিছু এলাকা এবং উত্তরবঙ্গের জেলা রংপুরকে বেছে নেয়া হয়। এসডোর গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ অংশেই মিনিপ্যাক বা স্যাশের ব্যবহার রয়েছে। আর মিনিপ্যাক মুক্ত আছে দেশের মাত্র ৩ শতাংশ এলাকা। দেশে যে পরিমাণ মিনিপ্যাক বর্জ্য তৈরি হয় তার মধ্যে খাবারের স্যাশে ৪০, প্রসাধনী ২৪, ওষুধ ৮, গৃহসামগ্রী পরিষ্কারের পণ্য ৭, রান্নার মসলা ৭, পানীয় ৭ এবং অন্যান্য বর্জ্য ৭ শতাংশ। খাবারের স্যাশের মধ্যে রয়েছে- চিপস, টমেটো সস, জুস, গুঁড়োদুধ, কফি ইত্যাদি। ওষুধের স্যাশের মধ্যে রয়েছে স্যালাইনের প্যাকেট ও মেডিসিন স্ট্রিপ। কসমেটিক স্যাশের মধ্যে আছে শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, টুথপেস্ট ও মাউথ ফ্রেশনার। রান্নার উপাদানকে মসলা প্যাকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এসডোর ২০২১ সালের গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, ঢাকা শহরে মোট একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য ছিল ৬০ দশমিক ৯৫ কেজি, যেখানে মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং ছিল ১২ দশমিক ৬৫ কেজি (মোট বর্জ্যের ২০ ভাগ)। মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং বর্জ্যের মধ্যে স্যাশে বর্জ্য ছিল ১০ ভাগ এবং ২ দশমিক ১৫ ভাগ ছিল মোট একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য। এর মধ্যে ১৪ ভাগ সসের স্যাশে, ৫৭ ভাগ শ্যাম্পু স্যাশে, ১৯ দশমিক ৪ ভাগ স্যালাইন প্যাকেট, ৬ দশমিক ৬ ভাগ কফির প্যাকেট এবং ৩ ভাগ চায়ের প্যাকেট ছিল। বলা হয়, মন্ট্রিয়ালের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি নতুন গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের চা ব্যাগে আমাদের মগে প্রায় ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা এবং ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ন্যানো প্লাস্টিক নির্গত হয়।

মিনি প্যাকেট পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক: সাবেক সচিব এবং এসডোর সভাপতি সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, প্লাস্টিকের মিনি প্যাকেট পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক। আকারে ছোট হলেও পরিবেশে এর বিরূপ প্রভাব বিশাল। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে বিশেষ করে স্যাশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কঠোরভাবে কার্যকর করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাই।
ব্যবহার বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ: এসডোর উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমান প্লাস্টিক স্যাশের (মিনি প্যাকেট) ভয়াবহ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে মানুষ মিনি প্যাকেটের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাই জনগণের মধ্যে আরও সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা এই মিনি প্যাকেটগুলো ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়। উৎপাদকদেরও উচিত এসব স্যাশে উৎপাদন বন্ধ করে রিফিল সিস্টেমের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দূষণ রোধে আমাদের সেই সময়ে ফিরে যেতে হবে যখন বাজারে স্যাশে ছিল না এবং মানুষ কেনাকাটার জন্য রিফিল সিস্টেম ব্যবহার করত। আর সে জন্য একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল, উৎপাদন ও বিপণনের ওপর অধিক শুল্ক আরোপ করতে হবে।

আইনি কাঠামো বাস্তবায়ন জরুরি: এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা প্লাস্টিক স্যাশের পরিবর্তে সাশ্রয়ী মূল্যের বিকল্প প্রচার করতে এবং একটি আইনি কাঠামো বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, জাতিসংঘ এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেম্বলি (ইউনিয়া ৫.২) ইতোমধ্যে একটি আন্তঃসরকারি কমিটি গঠন এবং ২০২৪ সালের মধ্যে লিগ্যালি বাইন্ডিং প্লাস্টিক কনভেনশন নিয়ে আলোচনা ও চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশসহ ১৭৫টি দেশ এই বৈশ্বিক প্লাস্টিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। তাই আমাদের উচিত নিজেদেরকে এর জন্য প্রস্তুত করা এবং দেশব্যাপী একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নেয়া।
প্লাস্টিকে ব্যবহার হয় ১৮টি কেমিক্যাল: বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। আবার যে প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহার করা যায়, সেটিও পরিবেশে থেকে যাচ্ছে। এখন সবকিছুর রংবেরঙের মিনি প্যাক তৈরি হচ্ছে। যত বেশি রং, তত বেশি কেমিক্যাল। এতে প্রায় ১৮টি কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। মিনি প্যাক কোনোভাবেই পুনরায় ব্যবহার করা যায় না। এসব পরিবেশে থেকে কোনো না কোনোভাবে মানবদেহে ফিরে আসে।

প্রতি ১১ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হারে ব্যবহার বাড়ছে : বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ, যে দেশে ২০০২ সালে আইনের মাধ্যমে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ২০০৬ সালের পর এর আর কোনো কার্যকারিতা নেই। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিবছর ৯ লাখ টন প্লাস্টিক আমাদের সাগর-মহাসাগরে যাচ্ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে ২০২৬ সালে এটা হবে ১ কোটি ১৮ লাখ টন হবে। বৃদ্ধির এ প্রবণতা হলো প্রতি ১১ বছরে প্রায় দ্বিগুণ। অনেকে মনে করেন, এতে তেমন কিছু হচ্ছে না। কিন্তু গত ১৫ বছরে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭৫ গুণ বেড়েছে। এখন শিশুরাও ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। আসলে প্লাস্টিকের রিসাইকেলও কোনো সমাধান নয়। প্লাস্টিক ঘুরেফিরে পরিবেশে থেকে যায়। তাই ধীরে ধীরে একবার ব্যবহারযোগ্য এবং শেষ পর্যন্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এর আগে গত জুনে প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলো এসডো। সাম্প্রতিক বাজেট প্রস্তাবের বিষয়ে এসডো একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রাধান্য পায় হাইকোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়। রায়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিককে নিষিদ্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের এ রায় অনুসারে, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি গেজেটে, ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী ১২টি জেলাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য যেমন প্লেট, গ্লাস, কাপ, চামচ, স্ট্র ইত্যাদি যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এবং অপচনশীল পণ্য, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়। এসডোর এ বিবৃতিতে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার ঐতিহাসিক রেজোলিউশনও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ পরিষদে একটি আন্তর্জাতিক আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য চুক্তি তৈরি করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে, যেখানে বাংলাদেশসহ ১৭৫টি দেশ চুক্তিটিকে সমর্থন করেছে।
ইউডি/সুপ্ত

