মনের পশুত্ব কোরবানি দিতে হবে

মনের পশুত্ব কোরবানি দিতে হবে
sacrifice-of-_উত্তরদক্ষিণ

মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম । সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:০৫

করোনাকালে সারা বিশ্ব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে বাংলাদেশে যোগ হয়েছে বন্যা। চলতি বছর বন্যায় বেশ কয়েকটি জেলার মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসবের মধ্যেই চিরাচরিত নিয়মে চান্দ্রমাসের হিসাবে ঈদুল আজহা আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। মুসলমানদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় উৎসব এই ঈদ। তবে এটি শুধু আনন্দের নয় এখানে আত্মত্যাগের মহিমা ও নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে সমর্পণ করার যে ইসলামের ইতিহাস তা সকলেরই জানা। তাই আমি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.) এর যে কাহিনী পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তা বিস্তারিত বলব না। শুধু ওই ঘটনার মধ্যে কি শিক্ষা অন্তর্নিহিত ছিল তা নিজের মতো করে বর্ণনা করব। কোরবানি শব্দের অর্থ বা শানেনুযুল জানা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

কোরবানির বিধান যুগে যুগে সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রমাণিত যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর দরবারে তার প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতেন। উদ্দেশ্য একটাই- আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানির এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওই সব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৪)।

কিন্তু আমরা কি দেখছি মানুষ এখন তার জীবন যৌবন পার করে দিচ্ছে দুনিয়াতে তাঁর অবৈধ সম্পদ অর্জনের পেছনে। রিজেন্টের সাহেদ, জেকেজির আরিফ ও ডা. সাবরিনা এরা সমাজে ভদ্রতার মুখোশ পরে নিজেদের মেধাকে প্রতারণা ও অপকর্ম করার কাজে ব্যয় করল। তারা তাদের দক্ষতাকে নীতিহীন ব্যবসায় বিনিয়োগ করল সততাকে ভুলে গিয়ে যার পরিণতি তারা ভোগ করছে। এরা তাদের মেধাকে কুরবানি করলো কিন্তু খারাপ দিকে। তাদের এই নীতিহীন মেধা আমাদের না কোনো কাজে এলো এবং তাদেরও না কোনো কাজে লাগছে। এই তো জীবন। কি হবে এতো অর্থ যা মৃত্যুকালে কোনো কাজেই আসছে না।

কোরবানি সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশনা এ রকম যে, কোরবানি হলো আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের অনন্য মাধ্যম। কোরবানির শুরু হয়েছিল হজরত আদম (আ.) সালামের দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের মধ্যে সংঘটিত কোরবানির মাধ্যমে। মুসলিম উম্মাহ কোরবানি মূলতঃ হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির পরীক্ষায় হজরত ইসমাইল (আ.) কে কোরবানির স্মৃতিময় ঘটনা নিজেদের মধ্যে বিরাজমান করা। আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম (আ.) কে কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছিলেন এ কোরবানির নির্দেশ প্রদান করে, যা তিনি হাসিমুখে পালন করে আল্লাহর প্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

সবাই জানি কোরবানির জন্য আল্লাহর হুকুম প্রাপ্তির সময় হজরত ইবরাহিম (আ.) তখন ৯৯ বছরের বৃদ্ধ। তিনি ও তার প্রাণপ্রিয় পুত্রকে আত্মনিবেদনে আল্লাহ তাআলা উভয়কে পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন। আর তিনিও মিনা প্রান্তরে সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে কোরবানির সে নির্দেশ পালন করেছিলেন। আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তার মানসিকতা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে গিয়েছিল। যা আজও মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর জিলহজ্ব মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ তিন দিনের যে কোনো একদিন পালন করে থাকেন।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লোক দেখানোর জন্য কোরবানির প্রচলন করেন নাই। বরং পশুকে জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশু ও আমিত্বকে জবাই করার তাওফিক দান করার শিক্ষা দিয়েছেন। কোরবানির মাধ্যমে নিজেকে মুত্তাকি ও পরহেজগার হিসেবে তৈরি করার তাওফিক ও সক্ষমতা দান করুন। আমাদের কোরবানির শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে। সত্য কথা হলো আমরা কোরবানির যে প্রকৃত শিক্ষা তা মুসলিম হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। বরং নীতিগত শিক্ষায় ও নৈতিকতার উৎকর্ষতায় নিদারুণভাবে দৈনতা প্রকাশ পেয়েছে। কুকর্মে ও অন্যায় কাজে নিজের জীবন যৌবন কোরবানি করছি। কোনো ভালো কাজ বা ত্যাগে নিজেকে সমর্পণ করছি না।

নিজের যা আছে তা ভালো কাজে উৎসর্গ করার মাঝে যে স্বর্গীয় সুখ তা শুধু দুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না আখিরাতেও পাথেয় হবে। বিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা শুধু গরু ছাগল কুরবানি করে গোশত খাওয়াকে ঈদ বানিয়ে নিলাম কাজের কাজ কিছুই হলো কি? মনে হয় হয়নি তাহলে এতো এতো দুর্নীতিবাজ, প্রতারক, চোর-বাটপার এবং মুখোশধারী পয়দা হতো না এবং পর্দা, বালিশ, মাস্ককাণ্ড দেখতে হতো না। যাই হোক আমরা অন্তত এই করোনাকালে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করতে পারি আমরা কোন দুর্নীতিবাজ ও প্রতারক লোক হতে চাই না। যারা দুর্নীতিগ্রস্ত, প্রতারক ও ত্রাণ, ভোট ও চাল চোর তাদেরকে বর্জন করি। লেখকের প্রাপ্ত তথ্যের উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতা রইল।
লেখক: কলামিস্ট, কবি ও আইন গবেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading