ইসির সঙ্গে ওইসিডিভুক্ত ১৪ রাষ্ট্রদূতের বৈঠক: শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫
জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশার কথা ইসির কাছে তুলে ধরেছেন উন্নয়ন সহযোগী ১৪ দেশের কূটনীতিক । রবিবার (৩ জুলাই বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপিয় ইউনিয়নের হাইকমিশনের নেতৃত্বে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টভুক্ত (ওইসিডি) ১৪টি দেশের রাষ্ট্রদূতরা এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সিইসি কাজী হাবিবুল আওয়ালও তাদের প্রত্যাশা পূরণে আশ্বস্ত করেন। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী ৩৮টি দেশের সংগঠন অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) প্রতিনিধিরা সিইসিসহ অন্যান্য কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রবিবার (৩ জুলাই) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংগঠনটির ১৪ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল, নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আহসান হাবিব, রাশিদা সুলতানা ও মো. আলমগীর। বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথাল চুয়ারড।

যেকোনো সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত ওইসিডি: নাথাল চুয়ারড বলেন, নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে, অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতে সহায়ক অবস্থা তৈরি করতে এবং সকল অংশীজনের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমাদের দেশগুলো নির্বাচন কমিশনকে যেকোনো প্রকার সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। গণতান্ত্রিক ধারাকে আরও শাণিত করার মধ্য দিয়ে নাগরিকদের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে সহায়তা করতে চায় ওইসিডি সদস্য দেশগুলো।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর জোর: সিইসি কাজী হাবিবুল আওয়াল বলেন, উনারা এসেছেন, এটা একটা ট্রাডিশন। আগেও এসেছেন তারই ধাবাবাহিকতা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন-কানুন, আমাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমরা আমাদের কার্যক্রমগুলো জানিয়েছি। উনার সাধারণত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। সেজন্যই উনারা ইলেকশনটা যদি ইনক্লুসিভ, একসেপ্টবল, ফ্রি এবং ফেয়ার হয়, তাহলে উনারাও খুশি হবেন, পুরো দেশবাসী খুশি হবেন এই আশাবাদ উনারা ব্যক্ত করেছেন। আমরা আমাদের দিক থেকে ইলেকশন কমিশন হিসেবে আমাদের যা যা করণীয় আমরা করবো। উনারা প্লিজড। বলেছি ভবিষ্যতেও যখন প্রয়োজন হয়, আসবেন।

‘সহযোগিতা নেয়া বিবেচনার বিষয়’: সহযোগিতার বিষয়ে প্রতিনিধিরা কিছু বলেছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন- ওরা যেটা বলেছে সহযোগিতা করার কথা। আমরা চট করেই নিজেরা কিছু বলিনি। আমরা বলেছি আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দেখবো। কোনো টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা উনাদের জানাবো। কী ধরনের সযোগিতা করবে, এই প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন- আমরা বলেছি সেটা আমরা বিবেচনা করে দেখবো। আমরা এখনো সহযোগিতা চাইনি।সক্ষমতা বাড়ানোর সহযোগিতা নাকি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা করবে? এই প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এটা ইলেকশন রিলেটেড। যেটা হতে পারে ভোটার এজুকেশন, ইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয় হতে পারে। আমি তো বলেছি আমরা উনাদের জানাইনি এখনো। আমরা যদি মনে করি কোনো রকম সহযোগিতা বা টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বা ট্রেনিং প্রয়োজন হবে, তখন উনাদের জানাবো। এজন্য নিশ্চিত করে বলতে পারছি না কী ধরনের সহযোগিতা উনারা দেবেন বা আমরা কী ধরনের সহযোগিতা চাইবো। উনারা পর্যবেক্ষকের কথা বলেছেন-আমরা বলেছি আমাদের দিক থেকে কোনো বাধা নেই। তবে এ বিষয়ে ডিপ্লোমেটিকলি আলোচনা করে দেখতে পারেন। ফরেন অবজারভারদের বিষয়ে আপনারা ফরেন মিনিস্ট্রিতে একটু কথা বলে দেখতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্বের বিষয়ে কোনো কথা বলেছেন কি-না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে উনারা তেমন কিছু বলেনি। উনারাও খুব ভালো করেই জানেন এখনো কিছু কিছু দল ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। উনারাও বিশ্বাস করেন, আমরাও চেষ্টা করে যাব, যেন ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়। যেসব রাষ্ট্রদূত আজ বৈঠকে ছিলেন তারা হলেন ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন, আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিটার ডি. হাস, কানাডার হাইকমিশনার লিলিও নিকোলস, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি ইস্ট্রুপ পিটারসেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি, ফ্রান্সের সহকারী রাষ্ট্রদূত গুইলাম অড্রেন ডি কেরড্রেল, জার্মানির রাষ্ট্রদূত আছিম ট্রস্টার, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকোনুনজিয়াটা, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত এনি গিয়ার্ড ভ্যান লিউয়েন, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন, স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো ডি আসিস বেনিটেজ সালাস, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি চুয়ার্ড, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মোস্তফা ওসমান তোরান ও জাপানের হেড অব মিশন ইয়ামায়া হিরোয়ুকি।

ইভিএম নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চায় ইসি: এদিকে, ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত পর্যালোচনা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। চলতি মাসেই নতুন করে নির্বাচনী সংলাপে বসার পরিকল্পনা চলছে ইসিতে। প্রথম ডাকেই দুই তৃতীয়াংশের বেশি দলের সাড়া পেয়েছে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে কতটি আসনে কীভাবে হবে, সবার মতামত বিশ্লেষণ করে মাস দুয়েকের মধ্যে তা চূড়ান্ত করতে চায় নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটি। আগামী বছরের শেষভাগে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা করে সব ধরনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে এগোচ্ছে কমিশন। ইভিএমে ভোট, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে ইসি মতামত নিচ্ছে, সঙ্গে করণীয় বিষয়ে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি নিজেদের এখতিয়ারও তুলে ধরছে। ইসির এ সংলাপ প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটি অংশের সাড়া পেলেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলোকে টানতে পারেনি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসের মধ্যে ইভিএমে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউপির দেড় শতাধিক এলাকায় ভোট করেছে। এরই মধ্যে পেশাজীবী, বিশিষ্টজন, সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, পর্যবেক্ষক সংস্থা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, সাবেক সিইসিসহ অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ হয়েছে। ইভিএমের কারিগরি বিষয় নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মতামতও কমিশন পেয়েছে।

৩৯টি দলের সঙ্গে পৃথক বসার পরিকল্পনা: নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবিব খান বলেন, ইভিএম নিয়ে ইসির আমন্ত্রণে রাজনৈতিক দলের মতামত, অধিকাংশ দলের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের অনুপস্থিতি, তাদের আগ্রহ-অনাগ্রহ ও সাম্প্রতিক নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহারে কমিশনের লব্ধ অভিজ্ঞতা- সার্বিক বিষয় নানা ধাপে আমরা বিশ্লেষণ করছি। জুলাই মাসে ইভিএম নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। সব কিছু পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেবে, কোন পদ্ধতিতে, কতটি আসনে ও কিভাবে যাব। ঈদের পরে ইসি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন’ বিষয়ে সংলাপ শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমরা দলগুলোর সঙ্গে জুলাই মাসে বসতে চাই। ঈদের পরেই সংলাপ শুরু করতে হবে। ইভিএম-এর কারিগরি বিষেয়ে একসঙ্গে ১৩টি করে দলকে নিয়ে তিন ধাপে বসেছিলাম; এবার ৩৯টি দলের সঙ্গে আলাদা আলাদা বসব, বলেন এ নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খানের মতে, ইভিএমের কারিগরি দিক নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকলে দলগুলো অবশ্যই তাদের ‘বিশেষজ্ঞ’ নিয়ে আসত। যেহেতু আনেনি, এ নিয়ে তাদের এক ধরনের ‘ইতিবাচক’ অবস্থান ধরে নেওয়া যায়। দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান কমিশন সব ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ইভিএমে ভোট করেছে। এসব নির্বাচনে কোনো সহিংসতা ছিল না, কেন্দ্র দখল ও জালভোটের অভিযোগ নেই, কারিগরি জটিলতাও সেভাবে হয়নি। ইতিবাচক বিষয়গুলোর পাশাপাশি মাঠের অভিজ্ঞতাগুলোসহ সব বিষয় যৌক্তিকভাবে নিয়ে স্বল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায় কমিশন। দক্ষ জনবল তৈরি, প্রশিক্ষণ, আসন সংখ্যা নির্ধারণ, ইভিএম প্রস্তুতে কারিগরি দিক ও অর্থ বরাদ্দের বিষয়ও এর মধ্যে থাকছে।
ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে যে ১৪ দল : রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছে ১৪টি দল: আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, তরিকত ফেডারেশন, সাম্যবাদী দল-এমএল, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ, গণফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি।

ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে যারা: ইভিএমের বিপক্ষে মত দিয়েছে ১৪টি দল: জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক অন্দোলন-এনডিএম, বাংলাদেশ কংগ্রেস, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, গণফোরাম, বাংলাদেশ ন্যাপ ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট।
ইসির সংলাপে যায়নি ১১টি দল: বিএনপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি।
ইউডি/সুপ্ত

