ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে

ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে

রেজাউল হায়দার । মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:১৫

অগ্নিকান্ডসহ যে কোনো বিপর্যয়কর ঘটনায় ভরসা হিসেবে বিবেচিত হন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে শিল্পায়ন হয়েছে আগের ২০ বা ৩০ বছরের চেয়ে বেশি। একের পর এক বহুতল ভবনও তৈরি হয়েছে। বেড়েছে জাতীয় অর্থনীতির পরিসর। অথচ এ সময়ে যৌক্তিক কারণেই ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও বাড়েনি লোকবল। বাড়েনি কেমিক্যাল আগুন নেভানোর সক্ষমতা।

সম্প্রতি সীতাকুন্ডের আগুনলানা গুদাম সম্পর্কে তথ্য গোপন করায় আগুনের ভয়াবহতা বেড়েছে। নয়জন ফায়ার কর্মীর প্রাণহানিও ঘটেছে একই কারণে। রাসায়নিকের আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষিত ১৫০ জন ফায়ার কর্মী রয়েছেন। তাদের কাজের জন্য রয়েছে বিশেষ সরঞ্জামাদি ও পোশাক। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে এমন প্রশিক্ষিত ১১ জন ফায়ার কর্মী থাকলেও শিল্প এলাকা সীতাকুন্ড ও পাশের কুমিরা ফায়ার স্টেশনে এ ধরনের প্রশিক্ষিত কেউ ছিলেন না। রাসায়নিকের আগুন নেভানোর জন্য বিদেশে প্রশিক্ষিত কর্মীদের নিয়ে ‘হ্যাজম্যাট’ নামের একটি ইউনিট রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের। এ ধরনের আগুনের ক্ষেত্রে ‘কেমিক্যাল প্রটেকশন স্যুট’ নামের বিশেষ পোশাক পরে কাজ করেন তারা। সদর দপ্তরসহ বিভাগীয় শহরে রাখা হয় এ দলের সদস্যদের। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা সাধারণ আগুন হলে নিজে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করবেন। তবে আগুন রাসায়নিক হলে অবশ্যই প্রশিক্ষিত হ্যাজম্যাট ইউনিটকে খবর দেবেন। সীতাকুন্ডে আগুন নেভাতে যেসব ফায়ার কর্মী গিয়েছিলেন তারা মনে করেছিলেন হয়তো গার্মেন্ট পণ্যে আগুন লেগেছে। আগুন নেভাতে পানি ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। কেমিক্যালের আগুন জানলে ফায়ার কর্মীরা সে ধরনের প্রস্তুতিই নিতেন। আগুন নেভাতে আসতেন প্রশিক্ষিত কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকীকরণের প্রকল্প ১০ মাস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঝুলে থাকাও দুর্ভাগ্যজনক। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে এ প্রকল্প সম্পর্কে দ্রম্নত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে গড়ে ১৬ হাজার। ইলেকট্রনিকস সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএসএসএবি) এক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আগুনে মারা যায় ২৩৩ জন, আহত হয় প্রায় পাঁচ হাজার। এছাড়া প্রতি বছর গড়ে ৪ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকার মালামাল ভস্মীভূত হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, কেবল সচেতন হলেই অনেক অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফায়ার সার্ভিসের কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, সচেতনতার অভাব এবং অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহার কারণে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ফায়ার সার্ভিস বিভিন্ন সময় পদক্ষেপ নিলেও তা যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরাদার করতে হবে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, বিড়ি-সিগারেট বা মশার কয়েলের আগুন সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে হবে। বিশেষ করে ঘনবসতি এলাকা, বস্তি, শিল্প-কলকারখানায় নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

বাংলাদেশে এ ধরনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা এটাই প্রথম। এ ছাড়া কোনো অগ্নিকান্ডে ফায়ার সার্ভিসের এত কর্মীর নিহত হওয়ার ঘটনাও এর আগে ঘটেনি। কেন এমন ঘটল? আগুন নেভাতে গিয়ে আগুনে পুড়ে ও বিস্ফোরণে ফায়ার সার্ভিসের এত কর্মীকে কেন জীবন দিতে হলো? নিহত ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের অনেকেই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের এই পরিবারগুলো এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিএম ডিপোর আগুন নিভে গেছে। হয়তো আবার কর্মচঞ্চল হবে এই কনটেইনার ডিপো। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের নিহত সদস্যদের পরিবারগুলো কি আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে? যে কোনো ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য ইমার্জেন্সি রেসপন্স ব্যবস্থা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের কোনো ঘটনা ভবিষ্যতে আর ঘটবে না এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading