তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার: নৈতিকতা রক্ষাই হোক একমাত্র অবলম্বন

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার: নৈতিকতা রক্ষাই হোক একমাত্র অবলম্বন

মহসিনা মান্নান এলমা । মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৩০

বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতিতে আজ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। যার ফলে জীবনযাত্রার মানও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের ফলে মানুষ যেমন উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করছে তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবনে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এটি ছাড়া একদিনও অতিবাহিত হয় না আমাদের। একটি গবেষণায় উঠে এসেছে; বর্তমানে শতকরা ৬৪ জন প্রতিদিন গড়ে ৪ ঘণ্টা করে কোনো না কোনো প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্রিনের সামনে সময় ব্যয় করে। আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। অন্যদিকে আমাদের কাছ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কেড়ে নিয়েছে। সভ্যতার উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির অবদান অপূরণীয়। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, প্রযুক্তির অকল্যাণকর দিকগুলো আমাদের অবস্থান কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। এর অপব্যবহার করে শিশু-কিশোর-যুবক এক অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ছে। জড়িয়ে পড়ছে অকল্যাণকর পথে, অপরাধের জগতে।

বিশেষ করে শিশু-কিশোররা রয়েছে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে সব শিশু-কিশোররা আসক্ত হয়ে পড়ছে অনলাইন গেমসে, পর্নোগ্রাফি, কিশোরগ্যাং, তথ্যচুরি, বস্ন্যাকমেইলিং, অবৈধ হ্যাকিং এবং জঙ্গিবাদ উগ্রবাদে। শিশুরা ফ্রিফায়ার পাবজি ইত্যাদি গেমসে ব্যস্ত থাকার ফলে মেধার বিকাশ সাধনে ব্যাঘাত ঘটে। পড়া-শোনায় পিছিয়ে পড়ে। বিষয়টি আলোচনায় আসায় কর্তৃপক্ষ এ গেমসগুলো বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ২০ হাজারের বেশি পর্নোগ্রাফি সাইট। পরিবারগুলোতে দেখা যায়, ছেলে এক কক্ষে, মেয়ে আরেক কক্ষে মুঠো ফোনে ব্যস্ত। ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করছে তারা। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীরা আসলে সৌজন্যটুকু করতে তারা অনাগ্রহী। বস্তুত, সে যে মুঠো ফোনে কোন জগতে চলে গেছে তার খবর কি অভিভাকরা, আমরা রাখছি? মূলত শিশুটি দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে পরিবারিক বাঁধন থেকে। সামাজিকভাবেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে শিশু কিশোররা। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে আজকের শিশু-কিশোররা ক্রমাগত আসক্ত হয়ে পড়ছে। আক্রান্ত হচ্ছে মানসিক রোগে বা ডিপ্রেশনে।

একথা সত্যি, মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে আঘাত হানার মাধ্যম হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিজের সব পরিচয় গোপন রাখতে পারে বলে কাউকে হুমকি দেওয়া, মিথ্যা সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া অথবা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে বিভিন্ন অনলাইন সাইটে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানকে বস্ন্যাকমেইল করছে অপরাধীরা। তা ছাড়া তথ্য হ্যাকিং সম্পর্কিত ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সি তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতাটি বেশি লক্ষ্য করা যায়। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে আমাদের তরুণসমাজ উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রদায়িকতার হিংসা হানাহানিও প্রযুক্তির অপব্যহারের মাধ্যমে হচ্ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার বন্ধে এখনি আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের সচেতন মহল এগিয়ে আসলে, সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আমাদের শিশু-কিশোর যুবসমাজ রক্ষা পেতে পারে। বিশেষ করে সাইবার অপরাধে ছেয়ে যাচ্ছে গোটা সমাজব্যবস্থা। এর থেকে বেরিয়ে আসতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

সর্বোপরি সামাজিক অবক্ষয় থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে শিশুকালে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। সত্য কথা বলা, মিথ্যা থেকে বিরত থাকা, কারও ক্ষতি না করা, কপটতা ও প্রতারণা পরিহার করা, কারও অসম্মান না করা, বড়দের শ্রদ্ধা করা ও ছোটদের স্নেহ করা ইত্যাদি গুণাবলি নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়। মানুষের মধ্যে যখন পশুশক্তি প্রবল হয়ে ওঠে তখন এ সব সদাচার আনুপাতিক হারে লোপ পায়। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে হলে নৈতিকতার লালন হবে। ব্যক্তি ও সমাজকে সুস্থভাবে গড়ে তুলতে হলে নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি সামাজিক অবক্ষয় থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে শিশুকালে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। মানুষের মধ্যে যখন পশুশক্তি প্রবল হয়ে ওঠে, তখন এসব সদাচার আনুপাতিক হারে লোপ পায়। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে হলে নৈতিকতার লালন ও কর্ষণের কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তি ও সমাজকে সুস্থভাবে গড়ে তুলতে হলে নৈতিক শিক্ষাই একমাত্র ভরসা এবং অবলম্বন।

লেখক- সমাজ বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading