যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: ঈদ যাত্রায় স্বস্তির বার্তা
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫
ঈদুল আজহার বাকি মাত্র চার দিন। এর মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। তবে, প্রতিবারের ন্যায় এবারের ঈদ যাত্রা একেবারেই ভিন্ন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের জন্য। কেননা স্বপ্নের পদ্মা সেতু যে খুলে দেয়া হয়েছে। আর তাই বরিশাল ও খুলনা বিভাগের লাখো যাত্রীরা এবার স্বাচ্ছন্দেই বাড়ি ফিরতে পারছেন। এছাড়াও দেশের অন্যান্য এলাকায় বিচ্ছিন্ন কিছু সমস্যা ছাড়া স্বস্তিতেই ঈদ যাত্রা হবে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী
ঈদ এলেই দেশের গণমাধ্যমগুলোতে হাজারো সংবাদে সয়লাব হয়ে যায়। এর প্রধান শিরোনাম দাঁড়ায় ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি। উৎসবপ্রিয় মানুষ মুসলমানদের প্রধান দুই উৎসবে (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) পরিবারের সঙ্গ পেতে মরিয়া হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই তারা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হলেও দিনটি পরিবারের সঙ্গে উৎযাপন করতে চায়। আর তাই নানান ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়ে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন। আবার ফেরার সময়ও তাদের একই সমস্যার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। কিন্তু গেলো ঈদুল ফিতরেও দেখো গেছে বিচ্ছিন্ন কিছু সমস্যা ছাড়া ঈদযাত্রা ছিলো বেশ স্বস্তির। এবার ঈদুল আজহায় তো সবচেয়ে বড় চমক স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এই সেতু গত ২৫ জুন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এর মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ এবারের ঈদযাত্রা করছেন নির্বিঘ্নে এবং স্বাচ্ছন্দে। এছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষও তাদের সড়কপথের দারুণ উন্নতির ফলে পূর্বের চেয়ে স্বাচ্ছন্দেই ঈদে বাড়ি ফিরতে পারছেন।

পদ্মা সেতুর প্রভাবে লঞ্চে আগ্রহ কম: ঈদ যাত্রায় লঞ্চের অগ্রিম টিকিট কেনায় আগ্রহ নেই যাত্রীদের। ফলে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বিগত ঈদগুলোর মতো অগ্রিম টিকিট কেনা নিয়ে যাত্রীদের ব্যস্ততার চিরচেনা দৃশ্য এবার নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু হওয়ায় সড়কপথমুখী এবার যাত্রীরা, যার প্রভাব পড়েছে নৌপথে। একাধিক লঞ্চ মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লঞ্চের যাত্রীরা এবার সড়কপথে ঈদযাত্রা করতে পারেন, এমন আশঙ্কায় এই ঈদে আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্রিম টিকিট ছাড়ার অপেক্ষা করেননি তারা। পদ্ম সেতু উদ্বোধনের আগে থেকেই অনেক লঞ্চ অগ্রিম টিকিট দেওয়া শুরু করে, বাকিরাও উদ্বোধনের পরে টিকিট দেওয়া শুরু করে। আগেভাগে টিকিট ছেড়েও কোনও লাভ হয়নি। বিগত ঈদগুলোতে যখন যাত্রীরা কাউন্টার থেকে কাউন্টার ঘুরতেন অগ্রিম টিকিটের জন্য, কালোবাজারে অধিক মূল্যে বিক্রি হতো টিকিট, এবার সেখানে হাঁক ডাক করেও মিলছে না যাত্রী। ফলে লঞ্চ মালিকদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। অবশ্য গার্মেন্টস ছুটি হলে যাত্রীর চাপ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। লঞ্চ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু হয়েছে, লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি আশানুরূপ নয়। ফ্যামিলি কেবিনগুলোর চাহিদা আছে। সিঙ্গেল কেবিনের টিকিট কেউ নিচ্ছেনই না।সুন্দরবন নেভিগেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার সিনিয়র সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়েছে। একটা বড় অংশের যাত্রী সড়কপথমুখী হবেন, এটা স্বাভাবিক। আমরা গত মাসের ২০ তারিখ থেকেই অগ্রিম টিকিট দিচ্ছি। যদিও টিকিট বিক্রি আমাদের আশানরূপ নয়। গার্মেন্টসগুলো ছুটি হলে যাত্রীর চাপ যদি বাড়ে। আমাদের পর্যাপ্ত লঞ্চ আছে। স্পেশাল সার্ভিস দেওয়া হবে। বিআইডব্লিউটিএ সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মো. শহীদ উল্যাহ বলেন, লঞ্চে অগ্রিম টিকিট বিক্রি হচ্ছে। আমরা লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি, যাত্রীর চাপ বেশি হলে স্পেশাল লঞ্চ চালু করা হবে। যদিও ঈদের সময়ে অন্যান্য সময়ের থেকে দ্বিগুণ লঞ্চ চলে। আশা করছি, হুট করে চাপ বাড়লেও কোনও সমস্যা হবে না।

উত্তরবঙ্গের জন্য নলকা সেতুর ঢাকামুখী লেনও চালু : ঈদে উত্তরবঙ্গের মানুষের ঘরে ফেরা নির্বিঘ্ন করতে সিরাজগঞ্জে নবনির্মিত নলকা সেতুর ঢাকাগামী লেনটিও খুলে দেওয়া হয়েছে। নেলটি খুলে দেওয়ার কারণে উত্তরের ২২ জেলার মানুষের কর্মস্থলে ফিরতে যানজটের ভোগান্তি কমার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হবে ঈদযাত্রাও। সোমবার (৪ জুলাই) সকালে জনসাধারণ ও যানবাহন চলাচলের জন্য ওই সেতুর ঢাকামুখী লেনটি খুলে দেওয়া হয়। এসময় সাসেক-২ এর প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. এখলাস উদ্দিন ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। ঈদুল ফিতরের আগে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল নবনির্মিত নলকা সেতুর উত্তরবঙ্গগামী লেনটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। এতে অন্যান্য বছরের চেয়ে গত ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের ঈদযাত্রা অনেকটা ভোগান্তিমুক্ত ছিল। সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জাহিদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের সচিবের নির্দেশে নবনির্মিত নলকা সেতুর ঢাকাগামী লেনটি খুলে দেওয়া হয়েছে। হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি লুৎফর রহমান বলেন, সোমবার নলকা নবনির্মিত সেতুর ঢাকাগামী লেনটিও খুলে দেওয়ায় হয়েছে। এই লেনটি খুলে দেওয়ায় ঈদুল ফিতরের মতো কোরবানির ঈদেও হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকাসহ হাইওয়ে থানার আওতাভুক্ত রাস্তায় কোনো যানজট হবে না। তিনি আরও বলেন, গত ঈদের মতো এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মঙ্গলবার (৫ জুলাই) থেকে মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে।

বিআরটিসির ‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ চালু: পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ঘরমুখো মানুষের সহজ ও আরামদায়ক যাত্রা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সোমবার (৪ জুলাই) থেকে ‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ আয়োজন করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)। গত ১ জুলাই বিআরটিসির ডিপো থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয় এবং আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত ঈদ সার্ভিসের বাস চলাচল করবে। সোমবার এ তথ্য জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা শেখ ওয়ালিদ ফয়েজ। তিনি জানান, ঢাকার মতিঝিল, জোয়ার সাহারা, কল্যাণপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপো (চাষাড়া) থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মতিঝিল বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে ঢাকা-খুলনা, দাউদকান্দি, দিনাজপুর, রংপুর ও নেত্রকোনা রুট। কল্যাণপুর বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে রংপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, নওগাঁ, নেত্রকোনা, রানিশংকৈল, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর রুট। গাবতলী ডিপোর নিয়ন্ত্রণে ঢাকা-আরিচা, রংপুর, দিনাজপুর, আরিচা ও পাটুরিয়া, যশোর রুট। জোয়ার সাহারা বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণ ঢাকা-পয়সারহাট, বিশ্বরোড-পাঁচদোনা, রংপুর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও বগুড়া রুট। মিরপুর বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে ঢাকা-বরিশাল, রংপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও নওগাঁ রুট। মোহাম্মদপুর বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে ঢাক-শরিয়তপুর, ফরিদপুর, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও নওগাঁ রুট। গাজীপুর বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে বিশ্বরোড-পাঁচদোনা, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রাম রুট। যাত্রাবাড়ী বাস ডিপোর নিয়ন্ত্রণে ঢাকা-রংপুর, শরিয়তপুর রুট।

বিমানের ৫৮টি অতিরিক্ত ফ্লাইট শুরু : আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা-কে কেন্দ্র করে যাত্রীদের সুবিধার্থে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট বাড়িয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। অভ্যন্তরীণ রুটে অতিরিক্ত ২৯টি (যাওয়া-আসা মিলে ৫৮টি) ফ্লাইট পরিচালনা করবে এয়ারলাইন্সটি। আজ মঙ্গলবার (৫ জুলাই) থেকে আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইটগুলো পরিচালিত হবে। বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জিএম-পিআর) তাহেরা খন্দকার জানান, ফ্লাইটের মধ্যে সৈয়দপুর রুটে অতিরিক্ত ৯টি (যাওয়া-আসা মিলে ১৮টি), যশোর রুটে অতিরিক্ত ৮টি (যাওয়া-আসা মিলে ১৬টি), বরিশাল রুটে অতিরিক্ত ৬টি (যাওয়া-আসা মিলে ১২টি) এবং রাজশাহী রুটে অতিরিক্ত ৬টি (যাওয়া-আসা মিলে ১২টি) ফ্লাইট পরিচালিত হবে। সাধারণ সময়ে অভ্যন্তরীণ রুটে সপ্তাহে ৯৫টি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান।
ইউডি/সুপ্ত

