সাইবার বুলিং: সন্তানের অনলাইনে গতিবিধি নজরে রাখুন
আবু সালেহ মুসা । বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
বিশ্বব্যাপী কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইলের ছড়াছড়ি। এই সহজলভ্যতার কারণে বেড়ে চলছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সাইবার অপরাধ, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে অপরাধের সংখ্যা বেশি বাড়ছে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরাই এসব অপরাধের শিকার হচ্ছে বেশি। প্রযুক্তির উৎকর্ষে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল সীমাবদ্ধ হচ্ছে এবং দিনে দিনে তা আরও প্রকট হচ্ছে। ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী, মাঠে। ময়দানে খেলাধুলা আজ কমে যাচ্ছে। অনলাইন গেমসে আসক্ত শিশুরা দিনে দিনে ঘরবন্দী হয়ে পড়ছে। গেমিংয়ের নেশায় আচ্ছন্ন এসব শিশু সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। না-বুঝে, না-চিনে একেবারে হাতের মুঠোয় অপরাধ ও অনৈতিক জীবনযাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। এটা অব্যাহত থাকলে শিশুদের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।
শিশুমন সবসময়ই নতুনের প্রতি আকৃষ্ট। এই আকর্ষণকে লক্ষ্য রেখে বিভিন্ন গেমস ও শিশুদের পছন্দের বিষয়ে টেনে নিতে মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটারের মাধ্যমে ইন্টারনেটে চলে মুক্ত বিচরণ। এভাবেই একসময় শিশুরা বুলিংয়ের শিকার হয়। অনলাইনে শিশুকে প্রলুব্ধ করা, হেয় প্রতিপন্ন করা, ভয় দেখানো, মানসিক নির্যাতন করাই হচ্ছে বুলিং। এ থেকে শিশুর মধ্যে হতাশা, হীনমন্যতা, লেখাপড়ার প্রতি অনিহা, ইনসমনিয়া এবং একসময় তা তাকে অপ্রকৃতিস্থ করে তুলতে পারে। সাধারণত বড়রা নিজেকে আড়াল করে ছোটদের বন্ধু সেজে এ পথে তাদের এগিয়ে দেয়। ই-মেইল ও ফোন কলের মাধ্যমেও এ বুলিং হতে পারে। শিশুদের অনলাইনে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ গেমস। গেমস কিনে খেলতে বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই পাইরেটেড গেমস ডাউনলোড করে সাধারণত গেমস খেলে থাকে। সাইবার সন্ত্রাসীরা এ বিষয়টি মাথায় রেখে পাইরেটেড গেমসের মধ্যে ম্যালওয়্যার ইন্সটল করে দেয়, যাতে ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে সাইবার সন্ত্রাসীরা সহজেই ঢুকে তাদের কার্যক্রম সহজে জোরদার করতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘক্ষণ বসে ও কম্পিউটারের স্ক্রীনে চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকায় মানসিক চাপ বৃদ্ধির সাথে ধমণীতে রক্ত জমাট বাঁধা, হার্টের সমস্যা, লিভারের সমস্যা, সমস্যা, ক্যানসার, কারপাল টানেল সিনড্রোমসহ স্বাস্থ্য সমস্যার আলোকে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধিত হতে পারে। তাই সার্বিক বিবেচনায় সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে সরকারের আইনের আরো প্রসারিত করার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের, প্রচারের, ব্যবস্থা গ্রহণের এবং সকল অভিভাবকের সন্তানের অনলাইনে গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের সন্তান যেন বিপদগামী না হতে পারে, সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে এবং এ লক্ষ্যে কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে।
শিশুদের তথ্যপ্রযুক্তি বইতে সাইবার বুলিংসহ এ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকলে শিশুরা সচেতন হবে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক শিশু বিষণ্ন থাকে। পাশাপাশি অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার জন্য শিক্ষকদের আরও বেশি প্রশিক্ষিত হতে হবে। অনেক অভিভাবকের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। তাই এর ব্যবহার সম্পর্কে অভিভাবকদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে, যেন শিশুদের নিরাপদে ইন্টারনেটে বিচরণ নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসন, আইটি বিশেষজ্ঞ, সবাইকে নিয়ে একটা নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, সাইবার ক্রাইম বন্ধে রি-অ্যাকটিভ ও প্রো-অ্যাকটিভ-দুভাবেই কাজ করছে তারা। যখন কোনো সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন ভিকটিমকে প্রতিকার প্রদানে, সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশের কয়েকটি ইউনিট কাজ করে। ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে একটি হেল্পডেস্ক আছে, যা সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান করে থাকে। যে কেউ এখানে প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য সরাসরি আসতে পারেন। কাউন্সেলিং বা পরামর্শসেবা দিয়ে সাইবার অপরাধ থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিরত রাখা জরুরি। এছাড়া বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলা এই ডিভিশন তদন্ত করে থাকে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সও দিয়ে থাকে। এছাড়া রয়েছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। এর অত্যাধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব দ্রুততার সঙ্গে মামলা নিষ্পত্তিতে সহায়ক হচ্ছে। এভাবেই সবার সচেতনতা এবং সতর্কতা সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে সহায়ক হবে এবং নিশ্চিত করবে আমাদের চারপাশের শিশুর স্বাভাবিক এবং নিরাপদ জীবনযাত্রা।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

