নিশ্চিত হোক জনগণের জীবনের নিরাপত্তার অধিকার
লাইজু আক্তার । বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:১০
বাংলাদেশ গত দেড় দশক ধরে একপ্রকার উন্নয়নের জোয়ার চলছে। এই জোয়ারের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। জ্বরে আক্রান্ত থেকেই নিম্নআয়ের দেশ থেকে মধ্যমআয়ের দেশে এসেছে বাংলাদেশ। তেলের দাম বাড়ছে, বাড়ছে গ্যাসের দাম, দ্রব্যমূল্য তো আকাশচুম্বী। তবু কত উন্নয়ন আমাদের। উন্নয়ন আর উন্নয়ন। এ উন্নয়নের মূল লক্ষ্য-মুনাফা বাড়ানো, জিডিপি বাড়ানো, মাথাপিছু আয় বাড়ানো। আর সেগুলো বেড়েই চলছে। কিন্তু উন্নয়ন মানে যে মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা, সে চিন্তা নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে কারো মধ্যে নেই। কারণ জাতি হিসেবে আমরা উন্নয়ন জ্বরে আক্রান্ত। আমাদের রাষ্ট্রের কাঁচামাল যে জনগণ সেটাও ভুলতে বসেছি। না হলে জনগণের নিরাপত্তা নেই কেন? জনগণের নিরাপত্তার বিধান করেই উন্নয়নে পা রাখতে হবে তা যেন সবাই ভুলতে বসেছে। তাই তো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আগুন দাউ দাউ করেছিল। আর আমরা চোখের জ্বলে তা নেভানোর চেষ্টা করেছি। আসলেই কি তা সম্ভব? আমরা বাংলাদেশিরা যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখি, দেখি পদ্মা সেতু পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে যাদের অবদান আমরা তাদেরকেই অবহেলায় রাখছি না তো?
একটি দুর্ঘটনা আমাদের অনেক কিছুই শিক্ষা দেয়, দেয় সতর্ক বার্তা। সেদিক থেকে বলতে হয় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। এরকম ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। তারপরও আমরা সতর্ক হলাম না কেন? প্রশ্নের উত্তর কি পাওয়া সম্ভব? একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক ডিপো, নেই অনুমোদনের লাইসেন্স। রাসায়নিক পদার্থ যে ঝুঁকিপূর্ণ তা সকলের জানা কথা তারপরও কীভাবে এরকম একটি ডিপো ঘনবসতিতে করা হয় বড়োই ভাবনার বিষয়। উন্নয়ন এতটাই প্রয়োজন যে এর দুর্ঘটনা আমাদের ক্ষতি করতে পারে সেটাও ভাবার সময় মনে হয় আর পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। বিএম কন্টেইনার ডিপোর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের জয়েন্ট ভেঞ্চার এই কোম্পানিটি ২০১১ সাল থেকে কাজ করছে। সেখানে গত ১১ বছর ধরেই একটি মৃত্যুকূপ তৈরী করা হলো তা সরকার কিংবা সরকারি কর্মকর্তা কেউ জানতেও পারলো না। কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই বাংলাদেশ আর নেদারল্যান্ডসের যৌথ উদ্যোগে চললো একটি রাসায়নিক ডিপো।
বিএম কন্টেইনারে আগুন, সবার আগে নিশ্চয় মালিকপক্ষের জানার কথা। তাহলে আগুন নেভাতে মালিকপক্ষের খোঁজ মিলল না কেন? কারণ কি? মালিকপক্ষ জানত ডিপোতে কী রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। তাহলে কেন সবাইকে জানানো হলো না? তারা জানতেন যে ডিপোতে আগুন লাগবে তাই কোনো প্রভাবশালী দলের শান্তির ছায়ায় ঘুমাচ্ছিলেন? এর উত্তর কি এ ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের দুই লাখ টাকা ও আহতদের চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমেই শেষ হবে? নাকি নিমতলী, চকবাজার, সেজান জুস কারখানাসহ আরো অনেক ছোট- বড় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হবে সীতাকুণ্ডে নিহত সাধারণ মানুষের নাম।
অগ্নিকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের শাস্তির আওতায় আনা হোক। তাদের শাস্তি দিয়ে সরকার নতুন নজির স্থাপন করুক। কারণ এর আগে এরকম ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর একটারও সুষ্ঠু সমাধান মিলেনি। পদ্মা সেতুর আলোয় আলোকিত হওয়ার উন্নয়ন দেখার আগে সীতাকুণ্ডের ঘটনার তদন্তের উন্নয়ন দেখাটা সময়ের দাবি। অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মতো এটাও চাপা না পড়ুক। বাতাসে লাশের গন্ধ থাকতেই আমরা সুষ্ঠু সমাধান চাই। সেই সাথে চাই প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে থাকা ব্যক্তিবর্গ তাদের দায়িত্ব পালনে যেন কোনোরকম হেরফের না করে সেদিকে কড়া নজরদারি ও জবাবদিহি। এরপর আর এরকম ঘটনা বাংলাদেশে না ঘটুক। আর শুনতে চাই না অগ্নি নিবারণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। সেদিকের উন্নয়নটা এখন একান্তই চাওয়া। যে উন্নয়ন জনগণের সহ্য হয় না। তাই এসব উন্নয়ন-অপমৃত্যু ও দুর্ঘটনার দায় অবশ্যই সরকার, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি সবাইকে নিতে হবে। আর দায় নিয়ে হেয়ালিপনা যেন সরকার, কর্তৃপক্ষ না করে। উন্নয়নগুলো জনগণকে ঘিরেই হোক। সেখানে জনগণের জীবনের নিরাপত্তাটা অন্তত যেন নিশ্চিত হয়।
লেখক- কলামিস্ট
ইউডি/সুস্মিত

