যোগাযোগ খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন দৃশ্যমান
মো. আবু নাছের । শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৫৫
উন্নয়নের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও সাহসী নেতৃত্বে দেশের স্থল যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। চলমান রয়েছে মহাসড়ক উন্নয়নসহ বেশকিছু মেগাপ্রকল্প। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
মহাসড়ক উন্নয়নে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক নেটওয়ার্ক রয়েছে। সরকার ২০০৯ থেকে বর্তমান মেয়াদে ৪৫৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চারলেন বা তদোর্ধ্বে লেনে উন্নীত করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা, আটলেন বিশিষ্ট যাত্রাবাড়ি-কাঁচপুর, চারলেন বিশিষ্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা, গাজীপুর-টাঙ্গাইলসহ বেশকিছু মহাসড়কের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ৪৪১ কিলোমিটার মহাসড়ক উভয়পার্শ্বে পৃথক সার্ভিস লেনসহ এবং ১৭৬ কিলোমিটার মহাসড়ক সার্ভিস লেন ব্যতীত চারলেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান।
ইতোমধ্যে সারাদেশের ১ হাজার ৭৫২ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ চারলেনে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে এবং আরো ৫৯০ কিলোমিটার সার্ভিসলেনসহ চারলেনে উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু আজ আর স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। প্রমত্তা পদ্মার উপর নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের সেতু। এ সেতু বাংলাদেশের গৌরব এবং সক্ষমতার প্রতীক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসী সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু আজ চলমান। পদ্মা সেতু উন্মোচন করেছে সাফল্য আর সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। উন্নয়নের সূচকে যোগ করেছে নবমাত্রা। দেশের সকল অঞ্চলকে অভিন্ন সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় এনে উন্নয়নের গতিকে বেগবান করতে শেখ হাসিনা সরকার ২০০১ সালে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সাথে সমগ্র দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
মেট্রোরেল আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে ছয়টি এমআরটি বা মেট্রোরেলের সমন্বয়ে উড়াল ও পাতালসহ প্রায় ১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি শক্তিশালী মেট্রো-নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এ ধারাবাহিকতায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে প্রথমবারের মতো উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল রুট-৬ এর নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের প্রায় ৭৮ ভাগ শেষ হয়েছে। প্রায় ১৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে এবং প্রায় চার কিলোমিটার রেল লাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের অগ্রগতি প্রায় ৪৮ ভাগ। উত্তরা ৩য় পর্ব হতে পল্লবী-রোকেয়া সরণি-ফার্মগেট-শাহবাগ-টিএসসি-দোয়েল চত্বর-তোপখানা রোড হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে মেট্রোরেল রুট-৬। এ রুটে ১৬টি স্টেশন থাকবে। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক নির্মাণকাজ শেষ হলে ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহণের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি যানজট কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। মেট্রোরেল রুট-৬ এর পাশাপাশি আরও দু’টি রুট নির্মিত হচ্ছে। এরমধ্যে মেট্রোরেল রুট-১ হচ্ছে এয়ারপোর্ট থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। প্রথম অংশ এয়ারপোর্ট হতে বাড্ডা-রামপুরা হয়ে কমলাপুর এবং দ্বিতীয় অংশ খিলক্ষেত হতে পূর্বাচল পর্যন্ত। এছাড়া ঢাকা মহানগরীর পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগ বাড়াতে চূড়ান্ত করা হয়েছে মেট্রোরেল-৫ এর রুট। এ রুটের দুটি অংশ। নর্দার্ন অংশ গাবতলী হতে হেমায়েতপুর হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এবং সাউদার্ন অংশ গাবতলী থেকে হাতিরঝিল হয়ে আফতাবনগর বালুরপার পর্যন্ত।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর নিচে প্রথম টানেল নির্মাণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ও স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের মহামান্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জি-টু-জি ভিত্তিতে টানেল নির্মাণের লক্ষ্যে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের কাজ চলছে বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা থেকে তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত। তৃতীয় ভাগে কাজ হবে তেজগাঁও থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত। এরই পর্যায়ে নির্মীয়মাণ প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের ভিত্তিতে এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। ওঠানামার ৩১টি র্যাম্প বাদে মূল এক্সপ্রেসওয়েটি হবে প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ হলে নগরীর বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা থেকে একেবারে কুতুবখালী পর্যন্ত খুব স্বল্প সময়ে পৌঁছা যাবে। সময় এবং খরচ দুটোই সাশ্রয় হবে। এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি চলবে ৮০ কিলোমিটার বেগে। যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হলে বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট, মগবাজার, পল্টন, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত সড়কের ওপর গাড়ির চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
সরকারের যোগাযোগবান্ধব নীতির ফলে এ খাতে ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দেশের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বিকাশ এবং যানবাহন সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় টেকসই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহের পাশাপাশি বাস্তবায়নাধীন ও পরিকল্পনাধীন কার্যক্রম শেষ হলে দৃশ্যমান হবে যোগাযোগ খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটবে।
স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রম করেছে। এ দেশটির আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। তথাপিও সকল সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আরও অনেক দূর পাড়ি দিয়ে সামনে এগোতে হবে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান এ দেশের জন্য অসামান্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির নামের সঙ্গেও অতপ্রোতভাবে জড়িত। সময়ের পরিক্রমায় তিনি এশিয়া ও বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একজন কিংবদন্তী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় নাম। রাজনৈতিক মঞ্চে তার আগমনের কারণে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন মূলত বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বিহীন যে শূন্যতা ছিল তা পূরণ হয়। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্যে তিনি যে সকল উদ্যোগ গ্রহণ করেন তার অন্যতম হলো যথাক্রমে সংবিধান প্রণয়ন, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে গতি সঞ্চার, মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অস্ত্রসমর্পনের নির্দেশ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুনর্গঠন, প্রথম সাধারণ নির্বাচন আয়োজন, প্রত্যেকটি মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর, শিক্ষা কমিশন গঠন, পরিকল্পনা কমিশন গঠন, ১ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যাংক জাতীয়করণ, মুদ্রা ও টাকা চালুকরণ, কৃষি সংস্কার, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নতি সাধন ইত্যাদি।
এছাড়াও বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রভূত কল্যাণ সাধন করেন। তার শাসনামলে ১২৭টি দেশ কর্তৃক স্বাধীনতার স্বীকৃতি আদায় করতে বাংলাদেশ সমর্থ হয়। অন্যদিকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার তার শাসনামলের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সাফল্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সাথে অনেক কিংবদন্তী, গুণীজন ও মহীয়সি নারী, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক, ও বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম জড়িত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির জন্য পাঞ্জেরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ইউডি/সিফাত

