ভেনামী চিংড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎ ভাবনার এখনই সময়

ভেনামী চিংড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎ ভাবনার এখনই সময়

মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান । রবিবার, ৩১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:৪৫

ইদানীং ফেসবুকে দেশে ভেনামী চিংড়ি চাষের অনুমোদনের জন্য সরকারের প্রতি জোড়ালো দাবি জানানো হচ্ছে। তারা বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের চিংড়ির বাজার এখন ভেনামীর দখলে। তাদের কথায় ভারত, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনে বাগদা চিংড়ির চেয়ে ভেনামী চিংড়ি দশগুণ বেশি উৎপাদন হচ্ছে’। ফলে ভবিষ্যৎ রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এ শিল্পটিতে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান, পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫২ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৬.৩৭ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ১.৩৯ শতাংশ। বিগত অর্থবছরে ৬৮,৯৩৫ মে. টন মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রপ্তানি করে ৪,৩১০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান আসে মাছ থেকে। দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ চাহিদার (৬০ গ্রাম) চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৬২.৫৮ গ্রাম হয়েছে।

চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিতে এবং রপ্তানি পণ্যের তালিকায় চিংড়ি একটি উলেস্নখযোগ্য স্থান দখল করে আছে এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে চিংড়ি চাষ কৃষি ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। বিগত ২০১৭-২০১৮ সালে প্রায় ৩৬,১৬৮ মে টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৩,৫২৭ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করা হয়ে থাকে এবং চিংড়ি চাষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকায়ন। আমাদের দেশে ৬০ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত দুটি প্রজাতির চিংড়ির চাষাবাদ চলছে। একটি হলো- গলদা আর অন্যটি হলো বাগদা। আন্তর্জাতিক বাজারে গলদার রপ্তানি ৩৫% আর বাগদা ৬৫%।

বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য প্রয়োজন হয় লোনা পানির। এর পোনা সৃষ্টি ও চাষাবাদ সবই উপকূলের লবণ পানিতে হয়ে থাকে। সারাদেশে ১৮৫৩০৮ হেক্টর চিংড়ি খামার থেকে গত বছর ৬৩১৭১ মে টন বাগদা উৎপাদিত হয়েছে (হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ৩৪১ কেজি)। ২০১৭-২০১৮ সালে প্রায় ২৬,৩২৬ মে টন বাগদা চিংড়ি রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২৭২০.৪৪ কোটি টাকা- যা চিংড়ি রপ্তানি আয়ের ৭৭ শতাংশের অধিক। দেশের ১০টি উপকূলীয় জেলায় বাগদা উৎপাদিত হলেও কেবল খুলনা বিভাগেই বাগদা চাষের ৭৬ শতাংশ (১ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরের অধিক) জলাশয় বিদ্যমান যা থেকে দেশে মোট উৎপাদিত বাগদার ৮১ শতাংশ (৫০ হাজার মে টনের অধিক) উৎপাদিত হয়। খুলনা জেলার ৩৬ হাজার হেক্টর জলাশয় থেকে ২০১৭-১৮ সালে ১২ হাজার মে টন বাগদা উৎপাদিত (মোট উৎপাদিত বাগদার প্রায় ২০ শতাংশ) হয়েছে। বাগদা চিংড়ির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের বাজার বিদ্যমান। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বাগদা এখন বিটি শ্রিম্প (বস্ন্যাক টাইগার শ্রিম্প) নামে পরিচিত। সুস্বাদু হিসেবে বিদেশে বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ির বেশ সুনাম রয়েছে। রপ্তানি বাজারের জন্য গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ করে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাতকারীরা ভ্যালু এডেড পণ্য বাজারজাত করে থাকে।

চিংড়ির আরেকটি প্রজাতি ‘ভেনামি’। চিংড়িটি লোনা পানির চিংড়ি। এর পোনা উৎপাদন এবং চাষাবাদ সবই লোনা পানিতে হয়। বাংলাদেশে এর চাষের সরকারি অনুমোদন না থাকায় ব্যবসায়ী মহল থেকে এর চাষের অনুমোদন দেয়ার জন্য জোড় দাবি জানানো হচ্ছে। এ চিংড়িটি ভারত, ভিয়েতমান ও ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশে চাষ হচ্ছে। এই সব দেশে অতি নিবিড় ( সুপার ইনটেনসিভ) পদ্ধতিতে এই চিংড়িটি চাষ করার ফলে স্বাভাবিক উৎপাদনের চেয়ে আট থেকে দশগুণ বেশি উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় কম মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে তারা সহজেই প্রবেশ করছে। এরই মাঝে আমাদের দেশের বস্ন্যাক টাইগার শ্রিম্প-বাগদা ‘সুস্বাদু’ হিসেবে এখনো আন্তত্মর্জাতিক বাজারে টিকে আছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অনৈতিক কর্মকান্ড যেমন চিংড়ির ভেতর জেলি, বার্লি, সাগু এমনকি কাচের গুঁড়া পুশ করার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির যথেষ্ট বদনাম রয়েছে। এর সঙ্গে ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতির কারণে মাঝখানে এক বছর চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ ছিল। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সব ধাপে ‘ট্রেসিবিলিটি’ নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আবার অনেক সময় বাগদার চাষে ভাইরাসের আক্রমণে চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। ফলে চাষিদের মন নাড়া দেয় ‘নতুন কিছুর’। ইদানীং ভেনামী চিংড়ির অধিক উৎপাদনের স্বপ্ন আর আলোচনায় মগ্ন চাষিরা। মৎস্য বিভাগ বলছে, ভেনামী চাষে ভাইরাসের সংক্রমণ ভীতি আছে। এরপরও ১১টি মৎস্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক চাষের অনুমতি দেয়া হয়েছে। চাষিদের অনেকেই রোগ জীবাণুর বিস্তারের এই ‘ভীতি’কে মৎস্য বিভাগ ও মৎস্য বিজ্ঞানীদের ব্যর্থতা ও অজ্ঞতা বলে দায়ী করছেন। তৃতীয় আরেকটি পক্ষ বলছে, ‘চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজার’ এখন দুষ্টুচক্রের জালে। তবে সবকিছু খেয়াল রেখে আমাদের চিংড়ি শিল্পটির ভবিষ্যৎ ভাবনার এখনই সময়।

লেখক :মৎস্যবিদ।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading