নবায়নযোগ্য জ্বালানি হোক আগামীর চালিকাশক্তি
মোহম্মদ জিল্লুর রহমান । রবিবার, ৩১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে যে অস্থিরতা ও সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সারা দেশে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুতের লোডশেডিং ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে গোটা বিশ্ব বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। একদিকে উন্নত বিশ্ব অবাধে কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে? এসব কারণে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সময়োপযোগী একটি পরিবেশবান্ধব শক্তি এবং কার্বন নিঃসরণমুক্ত উপাদান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় পৌঁছানোর জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্বের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে আসছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি এমন এক শক্তির উৎস, যা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় ব্যবহার করা যায় এবং শক্তির উৎসটি নিঃশেষ হয়ে যায় না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস যেমন-সূর্যের আলো ও তাপ, বায়ুপ্রবাহ, জলপ্রবাহ, জৈবশক্তি (বায়োগ্যাস, বায়োমাস, বায়োফুয়েল), ভূ-তাপ, সমুদ্র তরঙ্গ, সমুদ্র-তাপ, জোয়ার-ভাটা, শহুরে আবর্জনা, হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ইত্যাদি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়। দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি বা জ্বালানির ব্যবহার এবং এর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা কার্যকর করে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস হিসাবে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বায়ুমাস, বায়োফুয়েল, জিওথার্মাল, নদীর স্রোত, সমুদ্রের ঢেউ ইত্যাদিকে শনাক্ত করেছে। বাংলাদেশ যদি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, তাহলে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে পৌঁছাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এমন এক শক্তির উৎস যা কম সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার ব্যবহার করা যায়। এতে ওই শক্তির উৎস শেষ হয় না। এটি পরিবেশবান্ধব এবং কার্বন নিঃসরণমুক্ত। সেজন্যই বিশ্বের অনেক দেশ এখন বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে। বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সৌর শক্তি সবচেয়ে সম্ভাবনাময়; পাশাপাশি রয়েছে বায়োগ্যাস ও বায়োমাস। এছাড়া বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনাও বেশ ভালো। তবে তা এখনো গবেষণাধীন। বর্তমানে দেশের ১৩টি স্থান থেকে বাতাসের উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। পানি থেকে বিদ্যুৎ, সোলার পিভি ব্যবহার করে সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ, পৌর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গোবর ও পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস। আরও সম্ভাবনার জায়গা হলো বাতাসের গতি, ধানের তুষ, আখের ছোবরা, বর্জ্য, শিল্ট প্রক্রিয়ার অব্যবহৃত তাপ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির এ উৎস পর্যাপ্ত নয়।
আশার কথা হচ্ছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করছে। কারণ এক্ষেত্রে রয়েছে তাদের নিজ দেশের মানুষের এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদীদের চাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, রাশিয়া, ভারত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের জন্য রয়েছে আলাদা আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ফিড-ইন-ট্যারিফের ব্যবস্থা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে চীনে। নবায়নযোগ্য শক্তি বর্তমানে বিশ্বে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অধিকাংশ দেশ তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা মেটাতে নবায়নযাগ্য শক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের মধ্যে সৌরশক্তি সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং বায়োগ্যাস ও বায়োমাসের রয়েছে সীমিত ব্যবহার। বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানির অধিকাংশ ব্যয় হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন, মোটরযান চলাচল এবং বাসাবাড়ির তাপ উৎপাদনে। এজন্য নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, টেকসই যানবাহন ব্যবস্থা এবং গ্রিন টেকনোলজি সমৃদ্ধ শক্তি সাশ্রয়ী গৃহস্থালি পণ্য প্রবর্তনে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন গবেষণা প্রক্রিয়াধীন আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অঙ্গীকারের অভাব, জমির সংকট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং প্রচলিত জ্বালানির পক্ষে কঠোর আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে টেক অফের পর্যায়ে সব সেক্টরকেই বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হবে আগামীর চালিকাশক্তি।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

