নতুন অর্থবছরের বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

নতুন অর্থবছরের বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

আরেফিন মাসুম । মঙ্গলবার, ০২ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৩৫

দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়-বাণিজ্য করোনা মহামারি (কোভিড-১৯) ধাক্কাই এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মানুষের আয় কমেছে, অনেক মানুষ বেকার হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে অসংখ্য মানুষ। করোনা যখনই কমে আসছিল, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে তখন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে আবারও সংকটের মধ্যে পতিত করে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। বর্তমানে বৈশ্বিক পরিস্হিতিতে মূল্যস্ফীতির চাপটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য মূল্যস্ফীতি হয়তো বিরক্তিকর বিষয়, কিন্তু গ্রাম ও শহর এলাকায় দরিদ্র মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি নতুন সংকট তৈরি করছে।

মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ অতিক্রম করা মানেই দুঃসংবাদ। এতে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত মে মাসেই মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জুন মাসে তা আরো বাড়ল। দেশের মূল্যস্ফীতির হার এখন ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এর আগে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। অর্থাৎ বিগত ৯ বছরে এই জুন মাসের মতো এত মূল্যস্ফীতি আর হয়নি। কয়েক মাস ধরেই বাজারে চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাজারে সব ধরনের পণ্যেরই দাম বাড়তি আছে। এর ফলে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষকে ভুগতে হচ্ছে। এসব কারণে কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য আবারও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয় ধনী-গরিব নির্বিশেষে গড় হিসাবে। প্রকৃতপক্ষে গরিব মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে গরিব মানুষের ওপর প্রকৃত মূল্যস্ফীতির চাপ সরকারি হিসাবের চাইতেও বেশি। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের আয় না বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগের পরও দেশে ডলারের সংকট কাটছে না। ডলার-সংকট নিরসনে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেগুলো হলো—ব্যাংকের ডলার ধারণের সীমা (এনওপি) হ্রাস, রপ্তানিকারকের প্রত্যাবাসন কোটায় (ইআরকিউ) ধারণকৃত ডলারের ৫০ শতাংশ নগদায়ন, ইআরকিউ হিসাবে জমা রাখার সীমা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ইউনিটে স্হানান্তর। এ ছাড়া ৩০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বেসরকারি যে কোনো আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ২৪ ঘণ্টা আগে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে বিলাসদ্রব্যে আমদানিতে শতভাগ মার্জিনসহ ব্যাংক ঋণে নিরুৎসাহিত করা হয়।

দেশে জ্বালানি তেল ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে সার্বিকভাবে আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ডলারের ওপর চাপ পড়েছে। আবার রপ্তানি বাড়লেও তা আমদানির মতো নয়। প্রবাসী আয়ও বাড়েনি, বরং কমেছে। ফলে দেশে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে, তার প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ১৫ মাস আগের অবস্হায় ফিরে গেছে। কয়েক দিনের টানা দরপতনের কারণে বাজারে লেনদেনের এ অবস্হা তৈরি হয়েছে। কয়েক দিনের টানা পতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন আতঙ্ক ভর করেছে। আবার ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের পোর্টফোলির শেয়ার জোরপূর্বক বিক্রি বা ফোর্সড সেলের আওতায় পড়েছে। একদিকে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে, অন্যদিকে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের মধ্য থেকে বেড়েছে বিক্রির চাপ। দুই মিলে বাজার ছিল নিম্নমুখী। সার্বিক অর্থনীতি চাপে থাকায় চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকার কৃচ্ছ সাধনের পথে হাঁটছে। খরচ কমিয়ে আনতে বিদেশ ভ্রমণ, যানবাহন ক্রয় বন্ধ রাখা ছাড়াও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে আপাতত অর্থায়ন স্হগিত রেখেছে। নতুন অর্থবছরে দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লেখক: সমাজ বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading