ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধি: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচান

ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধি: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচান

রাকিবুল হাসান । বৃহস্পতিবার, ০৪ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:২০

আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে এবং ইউরিয়ার ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকার ইউরিয়া সারের দাম কেজিপ্রতি ছয় টাকা বাড়িয়েছে। সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ডিলার পর্যায়ে ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ১৪ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এটা ঠিক ইউরিয়া সারে সরকারকে অনেক ভর্তুকি দিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে সম্প্রতি সেই ভর্তুকির পরিমাণ আরো অনেক বেড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ৮১ টাকা। গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম তিন থেকে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছয় টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি কেজিতে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ভর্তুকিতে লেগেছিল সাত হাজার ৭১৭ কোটি টাকা, সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে লেগেছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। আবার এই ভর্তুকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) অনেক দাতা সংস্থার আপত্তিও রয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়েছে। ফলে সারের একটা সংকট তৈরি হয়েছে বৈকি। কিন্তু আমাদের কথা হলো, দেশের বাজারে সারের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে পারত। তা না করে দাম বাড়ানো হয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। আর ভর্তুকি কমাতে চাপ রয়েছে আইএমএফের। আমাদের কথা হলো, আইএমএফের প্রস্তাব বা চাপের চেয়ে সামাজিক বাস্তবতার যথাযথ মূল্যায়নই বেশি জরুরি। সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সারের ব্যবহার কমে আসবে।

এখন চলছে আমন ধান ফলানোর সময়, সারের ব্যবহার কম হলে আমনের উৎপাদন কম হবে এবং এরপর বোরো মৌসুমেও এর প্রভাব পড়বে। বলা বাহুল্য, ইউরিয়া সারের ওপর কৃষকের নির্ভরতা বেশি। সরকার হয়তো ভাবছে, ইউরিয়ার দাম বাড়লে কৃষক বিকল্প হিসাবে ডিএপি সারের ব্যবহার বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ইউরিয়ার দাম বেড়ে গেলে সব ধরনের সারের ব্যবহার কমে যায়। কারণ কৃষক সারের জন্য মোট যে খরচ, তা ঠিক রাখতে চায়। সারের দামবৃদ্ধির ফলে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। তার মানে দাম বাড়বে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পপণ্যের, সামগ্রিকভাবে যা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে।

বলা বাহুল্য, সারের মূল্যবৃদ্ধি মানে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, অর্থাৎ কৃষকের লাভ কম হওয়া। এমনিতে ফসল উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ কৃষকসমাজ এক ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় সারের দাম বাড়ায় কৃষকের লাভ যেহেতু কমে যাবে, সেহেতু পরের মৌসুমে তারা ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবেন। এমনিতেই আমরা খাদ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে তৈরি হবে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি, তখন আরও বাড়বে আমদানিনির্ভরতা।

দুই দফা বন্যায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। এই মুহূর্তে তাঁরা নতুন করে ধারদেনা করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। শ্রমিক, কীটনাশক, সেচ, জমি চাষসহ সর্বত্রই তাঁদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় সারের বাড়তি দাম তাঁদের কাছে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অনেক কৃষিবিদ দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি আপাতত স্থগিত রাখারও অনুরোধ করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, তা না হলে কৃষকরা ফসল উৎপাদনে নিরুৎসাহ হয়ে পড়বেন। দুইদফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। জানা যায়, ইউরিয়া সারের মজুদ সন্তোষজনক। তদুপরি আমাদের যেসব ইউরিয়া সার কারখানা রয়েছে, সেগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়ে পুরোদমে চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা করা গেলে আমদানির পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে। আমরা আশা করি ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি সরকার স্থগিত করার উদ্যোগ নেবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading