শিক্ষা নয়, সুশিক্ষাই হবে জাতির মেরুদন্ড

শিক্ষা নয়, সুশিক্ষাই হবে জাতির মেরুদন্ড

সামিয়া বিন্দু । শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:০৫

মানুষ একা চলতে পারে না বলে সে সমাজ তৈরি করে নেয়। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী একদল লোক যখন পরস্পরের সান্নিধ্যে এসে অভিন্ন জীবন-প্রণালি এবং সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখনই সমাজ গঠিত হয়। প্রতিটি সমাজের নিজস্ব আদর্শ আছে, যা রক্ষার দায়িত্ব সমাজের প্রত্যেক সদস্যের। অন্যদিকে সামাজিক ঐতিহ্য রক্ষা ও সদস্যদের উন্নয়নের লক্ষ্যে সমাজ ব্যাপক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে, যার অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা। সমাজ একদিকে শিক্ষাকে রূপদান করে; অন্যদিকে শিক্ষা সামাজিক অগ্রগতিতে অবদান রাখে।

ব্যক্তি ও সমাজ ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ। ব্যক্তি সমাজ গঠন করে; কিন্তু সেসব দিক দিয়ে সমাজ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিতও হয়। সমাজের সদস্য হিসাবে ব্যক্তি যে আদর্শ ও ঐতিহ্য ধারণ করে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। সেই ব্যক্তি প্রকৃত শিক্ষিত, যে সামাজিক আদর্শকে ধারণ ও লালন করে। এভাবে পরিবার, বিদ্যালয়, রাষ্ট্র ইত্যাদি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুর শিক্ষায় প্রভাব ফেলে। ব্যক্তি সচেতন এবং অবচেতনভাবে তার পরিবেশ তথা সমাজ থেকে যা কিছু শেখে, তা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান হিসাবে কাজ করে। এভাবে শিক্ষার পুরোপুরি অধিকাঠামোই সমাজের প্রয়োজন ও চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। কোনো সমাজের সব আকাঙ্ক্ষা ওই সমাজের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

এ কারণে শিক্ষাক্রম এবং কোনো শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম গ্রহণের আগে শিক্ষার বিভিন্ন সামাজিক উদ্দেশ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন হয়। এসবের মধ্যে প্রধান সমাজের অবস্থা, সমস্যা ও চাহিদা; শিক্ষার্থীর চাহিদা ও সমস্যা; সমাজের মৌলিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ; সমাজ উন্নয়নে সহায়ক ও দায়িত্বসম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টি; সমাজের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীর সার্বিক উন্নয়ন; সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী বৃত্তির সুযোগ সৃষ্টি এবং এগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদা দান; মানবিক সম্পর্ক সৃষ্টিতে সহায়ক মনোভাব তৈরি; শিশুকে সমাজের জন্য প্রস্তুত করা; সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টি; সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষা নবায়ন ও যুগোপযোগীকরণ এবং শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সমষ্টিগত ধারণার বিকাশ সাধন।

আজকের এই গণতান্ত্রিক যুগে বিদ্যালয়কে যেমন সমাজের কাছে নিয়ে আসা প্রয়োজন; তেমনি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রয়োজনে সমাজেরও কিছু শিক্ষামূলক দায়িত্ব আছে। শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর মানসিক উন্নয়ন। এ জন্য লেখাপড়া ছাড়া শিক্ষার্থীদের আরও কিছু দিকের উন্নয়ন প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক খেলার মাঠ, পার্ক, জিমনেসিয়াম, হাসপাতাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

সমাজের দায়িত্ব এসব সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ সুসংহত করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। তা ছাড়া নাগরিকের নৈতিকতার ওপরও সমাজের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা, উদার মনোভাব, সহিষ্ণুতা, কর্তব্যপরায়ণতা ইত্যাদি সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের নৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। আমাদের সমাজের সহযোগিতা ছাড়া এ দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজের অন্যতম দায়িত্ব শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত নৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। পরিবার এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে এ উদ্দেশ্যে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।

নিরক্ষরতা একটি অভিশাপ। সমাজ জীবনে এটি একটি পক্ষাঘাতের মতো। নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপ গৃহীত হলেও এর কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে সমাজের ওপর। সুতরাং সমাজের জন্য দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরি করা জরুরি বিষয়। এ ছাড়া প্রত্যেক সমাজের একটি আদর্শগত অবস্থান থাকে। একে সমুন্নত রাখা সমাজের দায়িত্ব। উন্নত আদর্শ নাগরিকদের মধ্যে সততা, শ্রমের মর্যাদা, আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মনির্ভরশীলতা সৃষ্টিতে সহায়ক। সমাজ এগুলো সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।শিক্ষার একটি প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌন্দর্য উপভোগের মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। সমাজ শিল্পকলা, অঙ্কন, সংগীত ইত্যাদি চর্চার সুযোগ করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটাতে পারে। এভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যখন সৌন্দর্যবোধ গড়ে উঠবে, তখন সে পরিবারে এবং সমাজে নোংরামি ও পঙ্কিলতাকে প্রশ্রয় দিবে না।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিক্ষা প্রক্রিয়া সরাসরি সামাজিক পরিবর্তনে সহায়তা করে না। ব্যক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে সামাজিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষভাবে শিক্ষা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। সমাজের দায়িত্ব হলো শিক্ষা-সহায়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং শিক্ষার সহায়ক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা। এভাবেই শিক্ষা সামাজিক পরিবর্তনে ও উন্নয়নে সহায়ক হবে।

লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading