অশ্রুঝরা আগস্ট : বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন সবার হৃদয়ে
মো. আবুল কাশেম । সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০০:৪৮
যুগে যুগে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যতিক্রমী কিছু মানুষের বিরল উপস্থিতি এ পৃথিবীকে মহিমান্বিত করেছে। এ রকম একজন আলোক প্রদীপ হলেন সর্বকালের সেরা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার জন্ম না হলে হয়তো এখনও পর্যন্ত আমরা পরাধীন থাকতাম। বঙ্গবন্ধু একটি আবেগের নাম। বঙ্গবন্ধু একটি চেতনা, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম। তার কথা মনে হলেই আমরা আবেগাপ্লæত হয়ে পড়ি। কারণ বঙ্গবন্ধুর জীবন, তার কর্মস্পৃহা, তার দূরদর্শিতা আর দশজন মানুষের চেয়ে ছিল আলাদা।
বঙ্গবন্ধুর কাজকর্ম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। মূলত এখানেই জাতির পিতা অসাধারণ। আর এ কারণে সর্বস্তরের বাঙালির প্রাণের স্পন্দন এ মহান ব্যক্তি। তার চেতনায় ছিল এ দেশ, দেশের মাটি ও মানুষ। তিনি ছিলেন সর্বক্ষেত্রে উদার। পদে পদে রয়েছে তার উদারতার উদাহরণ। তার ব্যক্তিজীবন উদারতার এক বিশাল ভান্ডার। তিনি চাইলেই হয়তো কোনো বিষয়কে সহজে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন কিংবা কারও বিপদে পাশে না দাঁড়িয়ে নীরব থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সব ঝামেলাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। মানুষের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করেছেন। সারাটা জীবন মানুষের জন্য কিছু করার প্রয়াস পেয়েছেন। নিজের বলে কিছু করেননি। পারিবারিক জীবনে বেশি সময় দিতে পারেননি। মূলত দেশটাকেই তিনি সংসার ভেবেছেন। এ দেশের কী করে ভালো হবে, এ চিন্তায় তিনি সবসময় মগ্ন থেকেছেন। কিন্তু ঘাতকদের কারণে তিনি বাস্তবায়নের সময় পাননি।
জাতির পিতার মহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে তার ব্যক্তিগত জীবনে এবং এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে সর্বদা তিনি এসব আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বলেছেন- ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব।’ আর এ আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য তার জীবনের মূল্যবান সময়গুলো কারাগারে কেটেছে। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ নানা বৈষম্যের প্রতিবাদ করায় তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তারপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এ মহান নেতাকে অন্ধকার কারাবাস করতে হয়েছে। এত মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের পরও তিনি দমেননি। তিনি ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা ভীরু কাপুরুষের মতো বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে স্বশস্ত্র আক্রমণ চালায়। যে আক্রমণের বর্বরতা ইতিহাসে বিরল। হামলার পর দেখা গেছে ভবনটির প্রতিটি ফ্লোরের দেয়াল, জানালার কাচ, মেঝে ও ছাদে রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে তর তাজা মৃতদেহগুলো পড়ে আছে। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঘাতকরা সেইরাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে উপস্থিত সবাইকে হত্যা করে। রেহাই পাইনি আট বছর বয়সের নিষ্পাপ ছোট্ট শিশু বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল।
এভাবেই নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে রচিত হয় বাঙালি জাতির জন্য আরও একটি কালো অধ্যায়। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার পরে এধরনের প্রতিদান অকল্পনীয়। বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারকে সেদিন নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কোনো একটি দেশের স্থপতি ও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে তার পরিবারের সদস্যসহ এমন ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সেদিনকার হত্যা শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যা ছিল না। হত্যা করা হয়েছিল একজন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতাকে। জনগণের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া একজন মহান ব্যক্তিত্বকে। ইতিহাসের বিস্ময়কর নেতৃত্বের কালজয়ী প্রণেতাকে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে। সেদিন গুলি করে তারা জাতির পিতাকে দৈহিকভাবে নিঃশেষ করেছে, কিন্তু তার আদর্শ? সেটা তো অমর, যে আদর্শে এদেশ সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। তাই বলা যায়, এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। পৃথিবীর বুকে বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন ততদিন।
লেখক: সমাজ বিশ্লেষক।
ইউডি/সিফাত

