ইতিহাসের মহানায়ক : মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র অভিবাদন

ইতিহাসের মহানায়ক : মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র অভিবাদন

অজয় কান্তি মন্ডল । সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০১:২৫

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক অফিসারের হাতে সপরিবারে নিহত হন। দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে অন্ধকারতম দিন। বাঙালি জাতি এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করে এবং সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করে বিশাল হৃদয়ের সেই মহাপ্রাণ মানুষটিকে, যিনি তার সাহস, শৌর্য, আদর্শের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাঙালি জাতির অন্তরে। ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির সুস্পষ্ট ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানি হানাদারদের ভাড়াটে চরেরা জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে বাঙালি জাতির আত্মাকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। মুয়াবিয়াপুত্র এজিদের হাতে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের মতো ১৫ আগস্টও ইতিহাসে একটি মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

‘বঙ্গবন্ধু’ যে উপাধিতেই তাঁর অতুল্য ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে। ছোট থেকেই নির্ভীক আর সাহসিকতার মূর্ত প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সবসময় সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন এবং ন্যায়ের পথে চলেছেন। অন্যায় অবিচারের বিপক্ষে তিনি দিয়ে গেছেন সর্বদা বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম এই মহানায়কের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিশোর থেকে কখনো পিছপা হননি ন্যায্য কথা বলতে। সবসময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন বীরদর্পে। তিনি ভীতি ও অত্যাচারের মুখেও শোষিত মানুষের অধিকারের আদায়ের সংগ্রামে সচেষ্ট থেকেছেন সর্বক্ষণ। অত্যাচার এবং অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এভাবেই তিনি ওঠেন বাঙালির প্রতিটি ন্যায্য অধিকার আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। আর সেজন্য শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। বঙ্গবন্ধু ছিলেন খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের পরম আত্মীয়। পৃথিবীর খুবই কম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাঁর মতো এতটা ঈর্ষানীয় জনপ্রিয়তা লাভ করতে পেরেছিলেন। তিনি সর্বদা ভাবতেন, সকল বাঙালি তাঁর বন্ধু। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, স্বাধীন দেশে কোনো বাঙালি তার নিজের বা পরিবারের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে না। আর এই বিশ্বাস থেকেই সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে তিনি থাকতেন তাঁর প্রিয় বাসভবন ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাসায়। বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার এ বাড়িটি বঙ্গবন্ধুর অসম্ভব প্রিয় ছিল। কিন্তু তাঁর এই অগাধ বিশ্বাসের কোনো মূল্যই দেয়নি অকৃতজ্ঞ কিছু নরপশু। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা ভীরু কাপুরুষের মতো বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে স্বশস্ত্র আক্রমণ চালায়। যে আক্রমণের বর্বরতা ইতিহাসে বিরল।

এ ঘটনার মাধ্যমে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি জাতির ঘাড়ে চেপে বসে। ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরানোর চেষ্টাও চলে। স্বাধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের শত্রæরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে এ দেশের স্বাধীনতাকেই হত্যা করতে চেয়েছিল। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের যে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়, তার পরিণতিতে জাতীয় রাজনীতিতে বারবার বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ সা¤প্রদায়িকতা ও দ্বিজাতিতত্বের বিভেদ নীতিকে কবর দিয়েছিল। তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলে ১৫ আগস্টের পর থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে তারা কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। বাংলাদেশের মানুষ সে ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়নি। ১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয় দেশবাসীর প্রত্যাশার পরিপূরক হিসেবে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও খুনিদের পাঁচজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে। মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক খুনিদের বিদেশ থেকে আইনি পথে দেশে এনে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে তার আদর্শ মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা চালিয়েছিল, খুনিচক্রের সদস্যরা তাতে সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু তার অপরাজেয় আদর্শ টিকে আছে প্রতিটি বাঙালিহৃদয়ে। ইতিহাসের মহানায়কের অমরাত্মার প্রতি আমাদের বিনম্র অভিবাদন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সিফাত

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading