তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করুন

তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করুন

আরাফাত হোসেন । মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বলতে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুসারে ক্রোমোজমের ত্রুটির কারণে যাদের নারী বা পুরুষ কোনো শ্রেণিতেই অন্তর্ভুক্ত করা যায় না তাদের বোঝানো হয়। আমাদের সমাজে তারা হিজড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। এই হিজড়া নামটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে চলে আসে তাদের অপরাধ বা হয়রানিমূলক কাজ। রাস্তাঘাটে, বাস-ট্রেন-লঞ্চে মানুষকে হয়রানি করে টাকা উত্তোলন করে তারা। আপাতদৃষ্টিতে এটা আমাদের চোখে অপরাধ বা হয়রানি লাগলেও তাদের এই কাজটি করার সুযোগ করে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র।

হিজড়ারা ভিন্ন লিঙ্গের হওয়ার কারণে তাদের আমাদের সমাজে বা রাষ্ট্রে নিচু চোখে দেখি এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করে থাকি। এক কথায় বলতে গেলে তারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবদিকে নিগ্রহের শিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যার কারণে দেখা যায় তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হতে অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য হয়। একজন নারীপুরুষ জীবনধারণ করার জন্য যে রকম মৌলিক চাহিদার প্রযোজন রয়েছে, তেমনি হিজড়াদেরও মৌলিক চাহিদা প্রযোজন রয়েছে। কিন্তু তারা ভিন্ন লিঙ্গের হওয়ার কারণে আমরা তাদের কথা তেমন মনে রাখি না। বরং তাদের জন্য তাদের পরিবারকে নিচু চোখে দেখি। এক কথায় হিজড়া সম্প্রদায়কে আমরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখছি। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ায় সমাজ-পরিবার-রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের প্রতি ঘৃণা কিংবা অবহেলা প্রদর্শনসহ সমাজচ্যুত করে রাখা অবশ্যই অবিচার। এদের বেঁচে থাকার অধিকার অগ্রাহ্যের পাশাপাশি এদেরকে সমাজচ্যুত করে কার্যত মানবাধিকার লংঘন করা হচ্ছে। রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারে স্থান না হওয়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোকে দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করতে হয়। রাস্তাঘাট, মহল্লার বাসাবাড়িতে, দোকানপাটে সন্ত্রাসীদের মতো চাঁদাবাজি করে অথবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে জীবন বাঁচাতে হয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোকে।

অনেক সময় দেখা যায় রাতের ট্রেনে-লঞ্চে তারা ঘুমন্ত মানুষকে জাগ্রত করে টাকা তোলে। যার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের বোঝা বানিয়ে না রাখি তাহলে ভিক্ষাবৃত্তি বা অপরাধমূলক কাজটি করতে হতো না। কারণ অভাব না থাকলে স্বভাব খুব অল্প মানুষের নষ্ট হয়। দেশের ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ কার্যক্রমের প্রাথমিক হিসাব মতে দেশে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন। এই সংখ্যাটি আমাদের মোট জনসংখ্যা থেকে হিসাব করে দেখলে দেখা যায় তারা সংখ্যায় অতি ক্ষুদ্র। তার পরও কেন তাদের বোঝা বানিয়ে রাখা হচ্ছে? চাইলে তাদেরও জনশক্তিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। আমাদের দেশের সব হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সরকারি উদ্যোগে একত্র করে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে তাদের শিক্ষা এবং পাশাপাশি আত্মকর্মস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য স্বতন্ত্র কোনো প্রতিষ্ঠান চালু করলে আশা রাখি আমাদের হিজড়া সম্প্রদায়কে ভিক্ষাবৃত্তি, অপরাধ ও হয়রানিমূলক কাজ থেকে মুক্ত করতে পারব। ধীরে ধীরে তাদের শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করতে পারলে তারাও দেশের বোঝা না হয়ে জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত রাখার কোনো যুক্তি নেই। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী মানব জাতিভুক্ত; রাষ্ট্রেরও নাগরিক। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অবজ্ঞা-অবহেলা করা, অচ্ছুৎ ভাবা অন্যায়। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো কার্যত শারীরিক প্রতিবন্ধী। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের যেভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা হয়; তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের ক্ষেত্রেও একই মনোভাব দেখানো উচিত। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো অধিকারবঞ্চিত হওয়ার কারণে অসহায় অবস্থায় রয়েছে। এদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে অনেকেই।

এরাও নানা অনাচারে লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোকে পুর্নবাসিত এবং মানুষের মতো বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। শিশুকালে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হলে তৃতীয় লিঙ্গের অনেকেই বড় বড় পদে কাজের উপযুক্ত হবে, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। এতে দেশ উপকৃত হবে। ভুলে যাওয়া যাবে না যে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো আমাদের পরিবারেই জন্মেছে এবং প্রকৃতির খেয়ালে তৃতীয় লিঙ্গ হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা-অবহেলা তথা মূলধারার বাইরে রাখার মানসিকতা দ্রুত পরিবর্তন করা উচিত।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading